28 April 2017
g+ tw Chapaibarta Faceook Page
Chapaibarta.com


হেমন্তদায়ক | মেহেদী উল্লাহ

Published:  
হেমন্তদায়ক | মেহেদী উল্লাহ
একবার অগোছালো এক আমাকে নিয়ে সোজা হেমন্তে গিয়ে উঠি। ওখানে আটষট্টি হাজার মতান্তরে ততোধিক গ্রামের মতো শেষ অঘ্রাণগুলোর শেষরাতে শীত সিগনাল দেওয়া শুরু

কবার অগোছালো এক আমাকে নিয়ে সোজা হেমন্তে গিয়ে উঠি। ওখানে আটষট্টি হাজার মতান্তরে ততোধিক গ্রামের মতো শেষ অঘ্রাণগুলোর শেষরাতে শীত সিগনাল দেওয়া শুরু করে। ট্রান্সপোর্টের ধারে লেপওয়ালাকে পেয়ে মুলামুলি বাদে একটা লেপ নিই—জাস্ট ভ্রাম্যমাণ অবস্থায় তাঁর হাত থেকে আমার হাতে, যেন মলিন লেপপ্রদান অনুষ্ঠান। সবচেয়ে কাছের রিকশাটাকে ইশারায় ডেকে লেপসহ উঠে বসে বললাম, ‘মামা, ভাসানী হল যান।’ মামা, আমি আর একটা রিকশা প্রশাসন পাড়ি দিতে দিতে ঝুপ করে শীত রাত আসতে থাকে, অথচ হেমন্ত-সন্ধ্যা। তারপর হেমন্তই যেন আরো গভীর থেকে গভীরতর হয় পৌষ-মাঘের মাখামাখিতে। অথচ আমি একটা কভার কিনতে সময় পাই না লেপের জন্য—আমার নিরর্থক লেপ-ব্যস্ততা অগোছালো রঙের কভারে ঢাকা। গ্রীষ্মে টের পাই, কভার ছাড়া লেপে কাটায়ে দিলাম শীত। অবশেষে বিরক্ত নিজের ওপর কম ভারী, গোছানো একটা চাদর জড়াতে ইচ্ছে করল তো!



গ্রামের কোনো কোনো মায়ের রসুইঘরে হেমন্তেই শীত আসত। অগ্রীম শীতের পিঠা বানিয়ে পাঠিয়ে দেয় তাঁরা মেয়ের শ্বশুরবাড়ি। জামাইকে চমকে দিতে। পিঠা পেয়ে জামাই সেবারই বুঝতে পারে, শীত বাকি নাই! মেয়েরা বলতই, ‘এবার শীতের পিঠা প্রথম আম্মাই খাওয়াইলো



যাই গেরুয়া গ্রামে, লেপ-তোষকের দোকানে যেয়ে ঘামতে ঘামতে অর্ডার দিই লাল লেপ-সাদা কভার, যেন ক্লান্ত নিবাসীর সওদা খরিদ—ইমপরট্যান্ট খুব একটা।
‘শীত তো অনেক দেরি, এই সিজনে লেপ দিয়া কী করবেন?’ দোকানদার কহেন।
‘আচ্ছা! আপনে বানাইতে থাকেন। সামনের হেমন্তে নিব। এই নেন অগ্রীম পাঁচশ’। ধীরে-সুস্থে বানাই ফেলেন।’
কভার এইবার বানাবই নিমিত্তে লেপ!
তারপর আসিতেছে মহাসমারোহের হেমন্তের অপেক্ষা। এইবার তোমার শেষ রজনী কাভার হবে কভারসমেত আরামপ্রদ জমকের লেপে।

দুই

আমার হেমন্ত ‘স্বৈরাচারী’। ভীষণ প্রিয় সত্ত্বেও আধিপত্যবাদী এক ঋতু। একনায়কের কারণেই ভয়। ছয় ঋতুর মধ্যে বাদবাকি পাঁচ ঋতুর জন্য খুব দরদ হয়। তারা আমার জীবনে গণতন্ত্র আনতে পারে না হেমন্তের ডিকটেটরশিপের কারণে। হয় না কেন এমন? হেমন্ত আর আসলোই না। তার অস্তিত্বের পতন হলো। সম্ভব না। সে আসে, সে প্রিয় বলেই আমার দুর্বলতার সুযোগ নিতে পারে, অন্য ঋতুদের ভোট দিই না।

হেমন্ত খবু ঋণগ্রস্ত। শরতের কাছেও তার ঋণ, শীতের কাছেও। যেন, কার্তিকে শরতের শেষ আর অঘ্রাণে শীতের শুরু। ‘শরতের’ আন্দোলনের ধাক্কা আর ‘শীতের’ তোষামদে আমার হেমন্ত কোনো এক স্বৈরাচারী কবি।
তবুও সে টিকে আছে!

তিন

মুরব্বিরা বলতেন, ‘হেরা আশ্বিনে রান্ধে, কাত্তিকে খায়।’
কিভাবে? এক মাসে ভাত পঁচে যায় না?
না। ভাবতে থাকো, বলো কেমনে সম্ভব?
পারি না।
সোজা তো। আশ্বিনের শেষ রাতে রান্না করে, কার্তিকের প্রথম দিন সকালে খায়।
এত্ত সোজা।

ছোটবেলায় এই সহজ জিনিসটা হেমন্ত আনতো। পাল্টে যেতে থাকত সবকিছু। বৃষ্টি-বাদল নাই, পানি টান ধরত, বালি উড়ত, ওষপড়া গাছ-গাছালি-ঘাস-পাখির ডানা, ফাঁকা মাঠ। হেমন্ত আমাদের মাঠে ডাকত। দূরে ইটপোড়ানোর প্রস্তুতি নিতেছে ব্রিকফিল্ড, আমরা প্রতিদিন মাটি পরীক্ষা করে আসতাম, আর অপেক্ষায় থাকতাম কবে মাটি শুকাবে, আমরা গোল্লাছুট খেলতে নামব—ক্ষেতে ক্ষেতে আরম্ভ হতো খেলার বছরটা। এই কালের নাম ‘সুদিন’।

চার

গ্রামের কোনো কোনো মায়ের রসুইঘরে হেমন্তেই শীত আসত। অগ্রীম শীতের পিঠা বানিয়ে পাঠিয়ে দেয় তাঁরা মেয়ের শ্বশুরবাড়ি। জামাইকে চমকে দিতে। পিঠা পেয়ে জামাই সেবারই বুঝতে পারে, শীত বাকি নাই! মেয়েরা বলতই, ‘এবার শীতের পিঠা প্রথম আম্মাই খাওয়াইলো।’

এমন অগ্রীম শীত পিঠার কনসেপ্ট এখন এই শহরে। রাস্তার ধারে, বিল্ডিংয়ের কোণায়, বৈদ্যুতিক খাম্বার নিচে, মহল্লার ছোট মাঠটার পাশে শীতের পিঠা বানিয়ে বেচে মহিলারা। যেন তারা শীতের দিনগুলির ভূমিকায় অভিনয় করছে, হেমন্তেই। খোলা থেকে কুয়াশা ওড়ে। চিতই পিঠা, ভাপা পিঠা এখন হেমন্তেই—নানান রকম বারোমাসি ভর্তাসহ। আমরা রাস্তায় রাস্তায় সন্ধার আন্ধারে নাস্তা করি।

পাঁচ

আজকাল ‘এক মাঘে শীত যায় না’র ‘শীত’টার বীজ হেমন্তেই বুনতে বাধ্য হচ্ছে ‘হাওয়া’ অফিস। আবহাওয়াবিদ বলে দেন সংবাদে, শেষরাতে হালকা কুয়াশাসহ শীত নামতে পারে।

গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের কারণে হয়ত কোনোদিন হেমন্তভাগে বৃষ্টি নামবে খুব আকাশ আন্ধার করে শ্রাবণ সন্ধ্যার মতো অথবা হেমন্তেই শীত মরে পৌষ-মাঘে চল্লিশা হয়ে যাবে।

ঋতু প্রকৃতির—উলটপালট হতেই পারে। কিন্তু আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশের? দেশটার ‘শীতে’ যেন ‘গ্রীষ্ম’ না আসে অথবা গ্রীষ্মে শীত।