30 March 2017
g+ tw Chapaibarta Faceook Page
Chapaibarta.com


রাষ্ট্রদূত হত্যার বিবরণ দিলেন সেই ফটো সাংবাদিক

Published:  20 December 2016
রাষ্ট্রদূত হত্যার বিবরণ দিলেন সেই ফটো সাংবাদিক

সোমবার বিকালে তুরস্কের রাজধানী আংকারায় একটি আলোকচিত্র প্রদর্শনী দেখতে গিয়েছিলেন বার্তাসংস্থা এপির ফটো সাংবাদিক বুরহান ওজবিলিচি।

কিন্তু প্রদর্শনী দেখতে গিয়ে দেখলেন তুর্কিতে নিযুক্ত রুশ রাষ্ট্রদূত আন্দ্রেই কারলভকে গুলি করে হত্যার ভয়াবহ দৃশ্য। তবে পেশাদার সাংবাদিক বুরহান ঐতিহাসিক দৃশ্যপটে ক্যামেরায় ক্লিক করতে ভুলেননি।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বুরহান ওজবিলিচির বর্ণনায় রাষ্ট্রদূত হত্যার ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে।

বুরহান বলেন, রাশিয়ার আলোকচিত্র প্রদর্শনীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটি দেখে গতানুগতিকই মনে হয়েছিল। তবে যখন গাঢ় কালো শার্ট ও টাই পরা একজন মানুষ বন্দুক দিয়ে গুলি চালাতে শুরু করলো, আমি হতভম্ব হয়ে পড়লাম, ভাবলাম এটি কোনো নাটকের দৃশ্য।

এটি ছিল ঠাণ্ডা মাথার সুনিপুণ হত্যাকাণ্ড। আমি এবং আরও যারা হামাগুড়ি দিয়ে বাঁচার চেষ্টা করছিল তারা ছিলাম আতঙ্কগ্রস্ত। ছোট ছাটের চুলের মানুষটির গুলিতে রুশ রাষ্ট্রদূত ঢলে পড়েন।

দ্য প্রিস্টিন আর্ট গ্যালারিতে অন্তত আটটি গুলির শব্দ শোনা যায়। হৈচৈ শুরু হয়ে গেল। লোকজন চিৎকার করছিল। তারা গ্যালারির স্তম্ভ এবং টেবিলের নিচে লুকিয়ে পড়ে। কেউ কেউ মেঝেতে শুয়ে পড়ে। আমি ছিলাম ভীত এবং বিভ্রান্ত। কিন্তু একটি দেয়ালের আড়ালে আশ্রয় নেয়ার সুযোগ পেয়ে আমি নিজের কাজটি করে ফেলি। মানে ঘটনা ছবি তুলে ফেলি।

রাশিয়ার বাল্টিক এলাকা কামচাটকা পেনিনসুলার ফিচার ছবি নিয়ে 'ভ্রমণকারীদের চোখে কালিনিনগ্রাদ থেকে কামচাটকা' শীর্ষক প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। আংকারায় আমার অফিসের খুব কাছে হওয়ায় আমি প্রদর্শনীটি দেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম।

আমি যখন প্রদর্শনীতে পৌঁছলাম ততক্ষণে বক্তৃতার পালা শুরু হয়ে গেছে। তুরস্ক-রাশিয়া সম্পর্কের প্রতিবেদনে ব্যবহার করা যাবে মনে করে রুশ রাষ্ট্রদূত আন্দ্রেই কারলভ বক্তৃতা শুরু করার পর আমি তার কাছাকাছি গিয়ে ছবি তুলতে শুরু করলাম।

রাষ্ট্রদূত ধীরে ধীরে কথা বলছিলেন। তিনি নিজের স্বদেশের কথা তুলে ধরছিলেন আর মাঝে মাঝে থামছিলেন যেন দোভাষী তার কথাগুলো তুর্কি ভাষায় অনুবাদ করতে পারেন। আমি এখনও মনে করতে পারি যে তাকে কতটা শ্বান্ত এবং বিনয়ী দেখাচ্ছিল।

এরপর চোখের পলকে গুলি শুরু হয়ে গেল এবং দর্শনার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল। আমার থেকে কয়েক পা দূরে রাষ্ট্রদূতের দেহ পড়েছিল। আমি তার মাঝে কোনো রক্তের দাগ দেখিনি, আমার ধারণা সম্ভবত তার পেছনে গুলি করা হয়েছে।

আসলে কী ঘটেছে তা বুঝে উঠতে আমার কয়েক সেকেন্ড সময় লাগছিল। একজন মানুষ আমার চোখের সামনে মারা গেল, আমার চোখের সামনে একটি প্রাণ নিরুদ্দেশ হয়ে গেল।

যখন বন্দুকধারী পুরিশ সদস্য মেভলুত মার্ত আলতিনতাস গ্যালারির ডান দিকে থাকা ভয়ে জড়োসরো মানুষগুলির দিকে অস্ত্র তাক করছিলেন, তখন আমি পিছিয়ে গিয়ে বায়ে সরে পড়ি।

প্রথমে আমি আসলে বুঝে উঠতে পারছিলাম না যে গুলি বর্ষণকারীর উদ্দেশ্যটা কি! আমি মনে করেছিলাম তিনি হয়তো চেচনিয়ার কোনো জঙ্গী। পরে লোকজন বললো, তিনি সিরিয়ার আলেপ্পো শহরের নাম করে চিৎকার করছিল।

সম্ভবত রাশিয়া বোমা হামলা চালিয়ে সিরিয়ার আসাদ সরকার বিরোধী বিদ্রোহীদের আলেপ্পো থেকে বের করে দেয়ার ঘটনায় তিনি ক্রুদ্ধ ছিলেন। এই যুদ্ধে বহু সাধারণ মানুষ মারা যায়।

মেভলুত 'আল্লাহু আকবার' বলেও স্লোগান দিয়েছিল। এছাড়াও সে আরবিতে কিছু কথা বলছিল যা আমি বুঝতে পারিনি।

বন্দুকধারী ছিল উত্তেজিত। সে রাষ্ট্রদূতের দেহের চারদিকে হাঁটাহাঁটি করছিল। দেয়ালে ঝুলানো কিছু ছবি সে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে ফেলে।

আমি অবশ্যই ভয় পেয়েছিলাম এবং বন্দুকধারী আমার দিকে ঘুরে গেলে কী বিপদ হবে তাও বুঝতে পারছিলাম। কিন্তু আমি কিছুটা এগিয়ে গিয়ে জিম্মি হয়ে পড়া দর্শনার্থীদের উদ্দেশ্যে তার তর্জনগর্জন করার ছবি তুলে ফেলি।

ওই সময় আমি চিন্তা করিছলাম যে, 'যদি আমাকে আঘাত করা হয় এবং এতে আমি আহত হই বা মারা যাই, তারপরেও এখানে আমি একজনর সাংবাদিক। আমাকে কর্তব্য পালন করতে হবে। আমি কোনো ছবি না তুলে পালিয়ে যেতে পারতাম। কিন্তু পরে যদি মানুষ আমাকে জিজ্ঞেস করতো যে তুমি কেন ছবি তোলোনি তাহলে আমি এর সঠিক জবাব দিতে পারব না।'

এমনকি আমি সেইসব বন্ধু এবং সহকর্মীদের কথা ভাবছিলাম যারা বিগত বছরগুলোতে সহিংসতাপূর্ণ এলাকাগুলোতে ছবি তুলতে গিয়ে মারা গেছেন।

আমার মন দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছিল। আমি দেখছিলাম বন্দুকধারী লোকটি নিজের উপর কন্ট্রোল হারানো না পর্যন্ত উত্তেজিত ছিল। তিনি চিৎকার করে সবাইকে পিছিয়ে যেতে বলেন। নিরাপত্তা কর্মীরা আমাদের গ্যালারি ছেড়ে যেতে বললে আমার সেখান থেকে চলে যাই।

কিছুক্ষণের মধ্যেই অ্যাম্বুলেন্স ও সাঁজোয়া যান এসে পৌঁছালো। এরপর পুলিশ অভিযান শুরু করে। এক পর্যায়ে অস্ত্রধারীকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

যখন আমি ফটো সম্পাদনা করার জন্য অফিসে ফিরে আসি, তখন আমি ছবিতে দেখতে পাই যে রাষ্ট্রদূত যখন বক্তৃতা করছিলেন তখন অস্ত্রধারী ঠিক তার পেছনেই দাঁড়িয়ে আছে, তাকে দেখে মনে হচ্ছিল তিনি রাষ্ট্রদূতের বন্ধু বা দেহরক্ষী। যুগান্তর।



সর্বশেষ খবর