29 March 2017
g+ tw Chapaibarta Faceook Page
Chapaibarta.com


রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪০ বছরে ৪১ খুন, বিচার হয়নি একটিরও

Published:  23 October 2016
 রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪০ বছরে ৪১ খুন, বিচার হয়নি একটিরও

বার্তা ডেস্কঃ ১৯৭৬ সাল। প্রেমের প্রস্তাবে সাড়া না দেওয়ায় নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্রী নীহার বানু। বীভৎস সেই ঘটনার মধ্য দিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শুরু হয় হত্যাকাণ্ড। আশির দশকে জামায়াত-শিবিরের উত্থানে শুরু হয় রাজনৈতিক সংঘর্ষ। অস্ত্রের ঝনঝনানিতে একের পর এক ঝরতে থাকে মেধাবী তরুণের তাজা প্রাণ। বিগত ৪০ বছরে ৪১টি চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। সেই মিছিলে রয়েছেন চারজন অধ্যাপকও।

ধারাবাহিক নৃশংস এসব হত্যাকাণ্ডের প্রতিটির পরই উত্তাল হয়ে ওঠে ক্যাম্পাস। শোক, প্রতিবাদ ও বিচার দাবিতে রাস্তায় নেমে সরব হয় শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। সরকারের মন্ত্রী, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসনের আশ্বাসে থামে আন্দোলন। তবে এ পর্যন্ত একটি হত্যাকাণ্ডেরও বিচার প্রক্রিয়া শেষ হয়নি। রায় হলেও উচ্চ আদালতে আপিল করায় নিষ্পত্তি হয়নি মামলার। ফলে দণ্ড কার্যকর করা যায়নি ঘাতকদের।

সর্বশেষ বুধবার রাতে নৃশংসভাবে মৃত্যু হয়েছে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মোতালেব হোসেন লিপুর। বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব আব্দুল লতিফ হলের ২৫৩ নম্বর কক্ষের আবাসিক ছাত্র ছিল সে। রাতে কক্ষ থেকে রুমমেটের অগোচরে 'উধাও' হয় সে। সকালে হল ডাইনিংয়ের রান্না ঘরের পাশের ড্রেনে তার লাশ পড়ে থাকতে দেখা যায়। তার মাথার পেছনে, হাত-পায়ে আঘাতে চিহ্ন রয়েছে বলে জানায় পুলিশ। সুরতহাল পর্যবেক্ষণ শেষে প্রাথমিকভাবে পুলিশের ধারণা এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। ফলে লিপুর মৃত্যু নিয়ে রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে।

২০১৪ সালের ৪ এপ্রিল শহীদ সোহরাওয়ার্দী হলে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয় ছাত্রলীগ নেতা রুস্তম আলী। অভিযোগ ওঠে- অসাবধানতায় ছাত্রলীগের এক নেতার পিস্তলের গুলিতে সে নিহত হয়। তবে ছাত্রলীগ হত্যাকাণ্ডে ছাত্রশিবিরকে দায়ী করে ক্যাম্পাসে আন্দোলনে নামে। তবে ঘটনার আড়াই বছর পার হলেও হত্যাকাণ্ডের ক্লু উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ। আদালতে চার্জশিট না দেওয়ায় শুরু হয়নি বিচার প্রক্রিয়া।

চলতি বছরের এপ্রিলে রাজশাহী নগরীর শালবাগান এলাকায় নিজ বাড়ির একটু দূরে দুর্বৃত্তদের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে খুন হন ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক ড. এএফএম রেজাউল করিম সিদ্দিকী। পুলিশের দাবি, হত্যাকাণ্ডে জেএমবি জড়িত। তবে ছয় মাস পার হলেও এখনো চার্জশিট জমা দিতে পারেনি তদন্ত কর্মকর্তা।

২০১৪ সালে ১৫ নভেম্বর বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন চৌদ্দপাই এলাকায় নিজ বাড়ির অদূরে খুন হন সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. শফিউল ইসলাম লিলন। হত্যার এক বছর পর ২০১৫ সালের ৩০ নভেম্বর রাজশাহী মহানগর যুবদল নেতা অনোয়ার হোসেন উজ্জ্বলসহ ১১ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করে পুলিশ। মামলাটি বিচার প্রক্রিয়া সেভাবে এখনও শুরু হয়নি।

২০১২ সালের ১৫ জুলাই পদ্মা সেতু নির্মাণে উঠানো চাঁদার টাকা ভাগাভাগি নিয়ে দ্বন্দ্বে সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয় ছাত্রলীগ নেতা আব্দুল্লাহ আল হাসান সোহেল। ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারিতে শাহ্ মখদুম হলে ছাত্রলীগ কর্মী ফারুক হোসেনের হাত-পায়ের রগ কেটে নৃশংসভাবে হত্যা করে শিবির ক্যাডাররা। পরে তার লাশ হলের পেছনে ম্যানহোলে ফেলে রাখে ঘাতকরা। ২০১০ সালের ১৫ আগস্ট অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ছাত্রলীগ কর্মী নাসরুল্লাহ নাসিমকে ছাদ থেকে ফেলে দেয় দলীয় নেতাকর্মীরা। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।

মূলত আশির দশকে ক্যাম্পাসে ছাত্রশিবিরের উত্থানে রাজনৈতিক সংঘর্ষ বাড়তে থাকে। শুরু হয় অস্ত্রের ঝনঝনানি। ১৯৮২ সালে ১১ মার্চ প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনগুলোর সঙ্গে শিবিরের সংঘর্ষে ছাত্রলীগ কর্মী মীর মোশতাক এলাহী নিহত হয়। সংঘর্ষে সাব্বির আহমেদ, আব্দুল হামিদ, আইয়ুব আলী ও আব্দুল জব্বার নামে চার শিবিরকর্মীও নিহত হয়।

১৯৮৮ সালে আসলাম হোসাইন ও আজগর আলী নামে দুই ছাত্র নিহত হয়। তাদেরকে শিবির নিজেদের কর্মী দাবি করে। ওই বছরে মে মাসে শিবির ক্যাডাররা ছাত্রমৈত্রী নেতা জামিল আকতার রতনকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। ১৯৮৯ সালে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সঙ্গে সংঘর্ষে শিবির নেতা শফিকুল ইসলাম নিহত হয়। একই বছরের শেষ দিকে সংঘর্ষ চলাকালে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান জাসদ ছাত্রলীগ নেতা শাহজাহান সিরাজ এবং পত্রিকার একজন হকার।

১৯৯০ সালে শিবির নেতা খলিলুর, ১৯৯২ সালে জাসদ ছাত্রলীগ নেতা ইয়াসির আরাফাত পিন্টু, ছাত্রলীগ কর্মী মুহাম্মদ আলী নিহত হন। ১৯৯২ সালে বিশ্ববিদ্যালয় পার্শ্ববর্তী একটি বাড়িতে বোমা তৈরির সময় বিস্ফোরণে শিবির ক্যাডার আজিবরসহ চারজন নিহত হন। একই বছরে জাসদ ছাত্রলীগ নেতা মুকিম নিহত হয়।

১৯৯৩ সালে ১৯ সেপ্টেম্বর রাতে শের-ই-বাংলা হলে ছাত্রশিবিরের সশস্ত্র হামলায় নিহত হয় ছাত্রমৈত্রী নেতা জুবায়ের চৌধুরী রিমু। একই বছর শিবির-ছাত্রদল সংঘর্ষে মুহাম্মদ ইয়াহিয়া নামে এক শিবির নেতা নিহত হয়। একই বছরের ফেব্রুয়ারিতে সংঘর্ষে ছাত্রদল নেতা বিশ্বজিৎ, ছাত্র ইউনিয়ন নেতা তপন রায়, শিবির নেতা মুস্তাফিজুর রহমান এবং রবিউল ইসলাম নিহত হয়।

১৯৯৫ সালে সংঘর্ষে ইসমাঈল হোসেন সিরাজী নামে এক ছাত্র নিহন হয়। ওই বছরের ফেব্রুয়ারিতে ছাত্রমৈত্রী নেতা দেবাশীর্ষ ভট্টাচার্য রুপমকে বাস থেকে নামিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে শিবির ক্যাডাররা। ১৯৯৬ সালে ছাত্রদল নেতা আমান উল্লাহ আমানকে কুপিয়ে হত্যা করে শিবির।

এদিকে ২০০৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভূ-তত্ত্ব ও খনিবিদা বিভাগের অধ্যাপক এস তাহেরকে খুন করা হয়। হত্যাকাণ্ডে তৎকালীন শিবির নেতা মাহবুবুল আলম সালেহী জড়িত ছিল বলে অভিযোগ ওঠে। তবে মামলার রায়ে চারজনকে ফাঁসির আদেশ দেয় আদালত। তবে উচ্চ আদালতে ২০১৩ সালের রায়ে বিভাগের শিক্ষক মিয়া মো. মহিউদ্দিন ও বাসার তত্ত্বাবধায়ক মো. জাহাঙ্গীরের ফাঁসির আদেশ বহাল রাখে। বেকসুর খালাস দেয় একই বিভাগের শিক্ষার্থী ও শিবির নেতা সালেহীকে। তবে রায়ে সন্তুষ্ট নয় জানিয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে পুরো মামলার কার্যক্রম রিভিউয়ের আবেদন করা হয়। ফলে এখনও ঘাতকদের দণ্ড কার্যকর হয়নি। আইনি জটিলতায় তা সম্ভব হয়নি।

২০০৪ সালে ডিসেম্বরে সকালে প্রাতভ্রমণে বের হয়ে সন্ত্রাসীদের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে নিহত হন অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহম্মদ ইউনুস। মামলায় আট জেএমবি সদস্যকে আসামি করে চার্জশিট দেয় পুলিশ। পরে ২০১০ সালে দুইজনকে ফাঁসির আদেশ এবং ছয়জনকে বেকসুর খালাস দেন আদালত। তবে উচ্চ আদালতে রিট করে আসামিরা। পরে তাদের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করে আদালত। রায়ে অসন্তুষ্ট জানিয়ে পরিবার মামলাটি পুরো তদন্ত কার্যক্রম পুনরায় করার আবেদন জানান। ফলে সেভাবে থমকে আছে বিচার প্রক্রিয়া।

বিচার হয়নি একটিরও : হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তদন্ত কমিটি গঠন করে থাকে। তবে এ পর্যন্ত একটি তদন্ত প্রতিবেদনও আলোর মুখ দেখেনি। ফলে এসব সংঘর্ষ ও দ্বন্দ্বে নিহতের ঘাতকরা দম্ভের সঙ্গে ঘুরে বেড়ায়। একই সঙ্গে মামলা হলেও বেশিরভাগ মামলার চার্জশিট এখনও জমা পড়েনি আদালতে। ফলে শুরু হয়নি বিচার কাজও। অধ্যাপক ড. ইউনুস ও অধ্যাপক ড. এস তাহের হত্যা মামলার রায় প্রকাশ হলেও রিট কিংবা আইনি জটিলতায় দণ্ড কার্যকর সম্ভব হয়নি। এমনটি ১৯৭৬ সালে শিক্ষার্থী নীহার বানু হত্যা অপরাধীদের দণ্ড আইনি জটিলতায় এখনও কার্যকর হয়নি। ফলে একের পর এক এসব হত্যাকাণ্ড চলছে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অভিযোগ- ঘাতকরা পার পেয়ে যাওয়ায় এধরণের অপরাধ প্রবণতা বাড়ছেই।

রাবি শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক মো. শহীদুল্লাহ বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর মূলত রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে বেশি হত্যার ঘটনা ঘটেছে। প্রতিটি ঘটনার পরই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বিচার চেয়ে আন্দোলন করে থাকে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও পুলিশ প্রশাসনের মাধ্যমে মামলার কার্যক্রম দ্রুত করতে অনুরোধ জানায়। তবে পুলিশ প্রশাসনের যথাযথ ভূমিকার অভাবে বিচার প্রক্রিয়া থমকে থাকে। এধরণের ঘটনা বেড়ে যাওয়ার একটি কারণ বিচারহীনতার সংস্কৃতি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনেরও উচিত ঘটনার পর তা দ্রুত তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া।পূর্বপশ্চিম।।



সর্বশেষ খবর