27 March 2017
g+ tw Chapaibarta Faceook Page
Chapaibarta.com


দিনাজপুরে ৯০০ বছরের পুরনো বিষ্ণু মন্দিরের সন্ধান

Published:  18 September 2016
দিনাজপুরে ৯০০ বছরের পুরনো বিষ্ণু মন্দিরের সন্ধান
দিনাজপুরে ৯০০ বছরের পুরনো  বিষ্ণু মন্দিরের সন্ধান পাওয়া গেছে।  কাহারোল উপজেলায় ডাবোর ইউনিয়নের মাধবগাঁও এলাকায় এই মন্দিরটি একাদশ থেকে দ্বাদশ শতকের  নবরথ বিশিষ্ট, যা বাংলাদেশে আবিষ্কৃৃত মন্দিরের মধ্যে এই প্রথম। এখানে দুষ্প্রাপ্য মোহিনীর মূর্তিও পাওয়া গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে এটি ভগবান বিষ্ণুর একমাত্র নারী অবতার। আর এই মূর্তিটি পূর্ব ভারতে পাওয়া প্রথম মূর্তি বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভাগবত ও পুরানে ভগবান বিষ্ণুর ২২টি অবতারের কথা বলা হয়েছে, মোহিনী তাদের মধ্যে অন্যতম এবং একমাত্র নারীরুপ। ভারত উপমহাদেশের পূর্বাংশে এটি প্রথম প্রস্তর নির্মিত মোহিনীর প্রতিমা।

২০১৪ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মঞ্জুরী কমিশনের অর্থায়নে দিনাজপুরে প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ চালায় বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি জরিপ দল। এই জরিপের অংশ হিসেবে চলতি বছরের এপ্রিলে কাহারোল উপজেলার ডাবোর ইউনিয়নের মাধবগাঁও এলাকায় খননের কার্যক্রম শুরু   করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের একটি দল। মাত্র দুই সপ্তাহের খননেই এখানে পুরাতন স্থাপত্যশৈলীর মন্দিরটি রয়েছে বলে নিশ্চিত হয় দলটি। এরপর বিষয়টির উপর গুরুত্ব দিয়ে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের অর্থায়নে টানা ৩ মাসের অধিক সময়ে ধরে খনন কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে যে স্থাপনাটি উন্মোচিত করেছেন তা বিষ্ণুমন্দির এবং সেটি একাদশ থেকে দ্বাদশ শতকের মধ্যকার পূর্ব ভারতীয় হিন্দু মন্দিরের গঠনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

স্থাপনাটির আদিমধ্যযুগ পূর্বভারতীয় মন্দির স্থাপত্যের সাথে এই মন্দিরের সামঞ্জস্য রয়েছে। বিশেষ করে উড়িষ্যার কলিঙ্গ স্থাপত্যশৈলী যেটি একাদশ এবং দ্বাদশ শতকে বিকশিত হয়েছিল সেই স্থাপত্যশৈলীর সাথে এর সামঞ্জস্য রয়েছে। এটি দু’টি অংশে বিভক্ত, একটি গর্ভগৃহ যেখানে পূজা বা উপাসনা করা হতো, এটি বিশেষ কিছু অভিক্ষেপ দিয়ে চিহ্নিত। এই অভিক্ষেপগুলোকে স্থাপনা শিল্পের বা শিল্পশাস্ত্রর ভাষা অনুযায়ী রথ বলা হয়। এখানে মোট ১১টি রথ রয়েছে, যার মধ্যে দু’টি উপরথ। পাশাপাশি কিছু আলামতের ভিত্তিতে এটি নবরথ বিশিষ্ট একটি মন্দির বলে নিশ্চিত করা হয়েছে। খননকালে এখানে প্রস্তর প্রতিমার ভগ্নাংশ হিসেবে হিন্দু দেবতা বিষ্ণুর সমপদাস্থানক ভঙ্গিতে দন্ডায়মান প্রতিমার হাতে থাকা শঙ্খ, চক্র, গদা, বিষ্ণুপ্রতিমার বনমালা শোভিত পায়ের ভগ্নাংশ এবং একটি দেবি প্রতিমার ভগ্নাংশ পাওয়া গেছে।

এই খনন কার্যক্রমে বগুড়ার মহাস্থানগড় থেকে আসা অভিজ্ঞ ১৩ জন শ্রমিকের সাথে আরও ২৬ জন স্থানীয় শ্রমিক কাজ করছেন। খনন দলে রয়েছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের ১০ জন শিক্ষার্থী। তারা প্রাচীন এই খননকাজে অংশগ্রহন করে স্থাপত্যের নকশা আকছেন।

ওই এলাকার অমৃত রায় জানান, এতদিন তারা এটিকে ঢিবি বলেই জানতো। কিন্তু এর ভিতরে যে এত  সুন্দর একটি মন্দির রয়েছে তা তারা কোনভাবেই অনুমান করতে পারেনি। তিনি জানান, অনেকেই এখানে ছাগল-গরু বাঁধতো।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক সীমা হক জানান, আবিষ্কৃত মন্দিরটির প্রবেশদ্বার পূর্ব দিকে। প্রাচীন এই মন্দিরের নকশা ও স্থাপত্যশৈলী দেখে সহজেই অনুমান করা যায় এক সময়ে এই অঞ্চল উন্নত ও সমৃদ্ধ ছিল। কিন্তু কালের বিবর্তণে এই অঞ্চল অবহেলিত হয়ে পড়ে।

খনন দলের প্রধান জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. স্বাধীন সেন জানান, স্থাপনাটির স্থাপত্যিক বৈশিষ্ট্য আদিমধ্যযুগ বা খ্রীষ্টিয় ষষ্ট শতক থেকে ত্রোয়োদশ শতকের পূর্বভারতীয় স্থাপত্যশৈলীর সাথে সামঞ্জস্য রয়েছে। কিছু আলামতের ভিত্তিতে তারা নিশ্চিত হয়েছেন এটি একাদশ বা দ্বাদশ শতকের নবরথ বিশিষ্ট একটি বিষ্ণু মন্দির। মন্দিরটি দু’টি অংশে বিভক্ত। পশ্চিম দিকে ১২/১২ মিটার নিরেট প্লাটফর্মের ছোট কক্ষ রয়েছে। যেখানে প্রতিমার উপাসনা হতো। মন্দিরের বহির্গতের অভিক্ষেপের সংখ্যা ৯টি। তাই এটিকে নবরথ মন্দির বলা হচ্ছে। তিনি জানান, এটি বাংলাদেশে আবিস্কৃত প্রথম নবরথ মন্দির। এর আগে দিনাজপুরের নবাবগঞ্জে একটি পঞ্চরথ মন্দির আবিষ্কৃত হয়েছিল।

অধ্যাপক ড. স্বাধীন জানান, মন্দিরটির স্থাপনারীতি ও গঠনশৈলী নিয়ে ভারতের কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও ভারতীয় স্থাপত্যের বিশেষজ্ঞ দীপক সঞ্জন দাসের সাথে আলাপ হলে তিনি জানিয়েছেন- মন্দিরটির উপরিকাঠামো পশ্চিম বাংলার বাকুড়া জেলার সিদ্ধেশ্বরী মন্দিরের সাথে সামঞ্জস্য রয়েছে। পাশাপাশি খনন কাজের শেষ দিকে ঢিবির পূর্বাংশ থেকে একটি দুস্প্রাপ্য প্রতিমার ভগ্নাংশ পাওয়া গেছে। প্রতিমাটি সম্পর্কে দক্ষিণ এশিয়ার প্রখ্যাত প্রতিমালক্ষনবিদ ও প্রাচীন শিল্পকলার ইতিহাসবিদ ক্লদিন বুদজে পিক্রো সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রতিমাটিকে বিষ্ণুর নারী অবতার মোহিনী হিসেবে শনাক্ত করেছেন।

ক্লদিন জানিয়েছেন, প্রতিমাটি ভারত উপমহাদেশের পূবাংশে এই প্রথম প্রস্থরনির্মিত বিষ্ণুর নারী অবতার মোহিনীর মুর্তি। নবরথ বিষ্ণু মন্দির ও দুষ্প্রাপ্য মোহিনীর প্রতিমা পাওয়ায় এই অঞ্চলের ইতিহাস, ইতিহাসের স্বাক্ষ্য ও ঐতিহ্য সম্পর্কে নতুন ভাবনার মোড় নিয়েছে।

অধ্যাপক সেন জানান, স্থানীয়দের দাবি রয়েছে এটি যেন উন্মুক্ত করে দেয়া হয়, কিন্তু সেটি করতে হলে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অনুমোদন ও সংরক্ষণ করা লাগবে। সংরক্ষন না করেই এভাবে রেখে দিলে কিছুদিনের মধ্যে এটি নষ্ট হয়ে যাবে। বিষয়টি এলাকার লোকজনকে বোঝানো হয়েছে। প্রায় ৬শ’ গ্রামবাসীর স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে স্থানটি সংরক্ষণ ও উন্মুক্ত করে দেওয়ার জন্য।



সর্বশেষ খবর