26 June 2017
g+ tw Chapaibarta Faceook Page
Chapaibarta.com


‘ঝন্টু আর্ট’ থেকে গানের সংগ্রাহক

Published:  
‘ঝন্টু আর্ট’ থেকে গানের সংগ্রাহক

ঝন্টু আর্ট। একটা সময় এই দুটি শব্দ ছাড়া বাংলা ছবির পোস্টারই যেন দেখা যেত না। পোস্টার আঁকিয়ে রফিকুল হক ঝন্টুর সংগ্রহে আছে পুরোনো দিনের বাংলা গানের দুর্লভ সব রেকর্ড লং প্লেয়িং রেকর্ড—এলপি। এক্সটেন্ডেড প্লেয়িং—ইপি। সিঙ্গেল প্লেয়িং—এসপি। প্রায় শতাব্দী পুরোনো এসব রেকর্ডের স্তূপের মাঝখানে বসে আছেন তিনি। নিমগ্ন কবির মতো। ঘরে বাজছে ১৯২৩ সালে কমলা ঝরিয়ার (১৯০৬-১৯৭৯) গাওয়া ‘বন্ধু বাঁশি মন উদাসী/ কইলো আমারে’ গানটির লং প্লে। অনেকক্ষণ ধরে বসে আছি তাঁর মুখোমুখি। গানটিতে তিনি বুঁদ হয়ে আছেন। এবার মুখ তুলে তাকালেন। তিনি রফিকুল হক ঝন্টু। বাংলা গানের এক বিশাল সংগ্রহ তাঁর কাছে। গানের ‘চলন্ত বিশ্বকোষ’ বললেও বেশি বলা হবে না। দুই বাংলার প্রায় ২০০ শিল্পীর বিচিত্র ধারার গানের আসল রেকর্ডের সংগ্রাহক। সংগ্রহে আছে ১৯০৯ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত প্রায় ১৫ হাজার গান। বেশির ভাগ গানের ঠিকুজি (গানটির বিস্তারিত তথ্য) নিমেষে বলে দিতে পারেন। রেকর্ড সংগ্রহ করা ছিল তাঁর নেশা। কিন্তু পেশা ছিল সিনেমার পোস্টার আঁকা। 

রফিকুল হক ঝন্টুর জন্ম ১৯৫৩ সালে। ফেনীর দাগনভূঞা উপজেলার গনিপুরে। ছোটবেলায় ঢাকায় চলে আসেন। মাথায় সিনেমার পোকা আর মনে গানের মাকড় ঢোকে তখনই। বাড়ি থেকে পালিয়ে সিনেমা দেখতেন। তবে হলে না ঢুকে হলের ফটকের ওপরে টানানো পোস্টারের সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতেই ভালো লাগত। মুগ্ধ চোখে নায়ক-নায়িকাদের ছবি ও তাঁদের অঙ্গভঙ্গি দেখতেন। এভাবে দেখতে দেখতে পোস্টার আঁকিয়ে হওয়ার ‘ভূত’ চাপে মাথায়।১৯৬৮ সালের দিকের কথা। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের প্রবাদপুরুষ জহির রায়হান তখন ঢাকার কায়েতটুলীতে থাকতেন। ঝন্টুরা থাকেন আলাউদ্দিন রোডে।​ তিনি বলেন, ‘জহির রায়হান তখন জীবন থেকে নেয়া চলচ্চিত্রের কাজ সবে শুরু করেছেন। সাহস করে একদিন তাঁর সঙ্গে দেখা করলাম। ছবির পোস্টার আঁকতে চাই, জানালাম।’ ২১ আগস্ট ঢাকার মোহাম্মদপুরে নিজের বাসায় বসে কথাগুলো বললেন রফিকুল ইসলাম ঝন্টু। ঝন্টুর হাতের লেখা সুন্দর ছিল। লেখা দেখে জহির রায়হানের পছন্দ হলো। সে পর্যন্তই। স্বাধীনতার পরপরই নিখোঁজ হন জহির রায়হান। তাঁর পরিচালিত চলচ্চিত্রের পোস্টার আঁকার সুযোগ হলো না ঝন্টুর। এবার তিনি নায়ক রাজ্জাকের কাছে গিয়ে ইচ্ছার কথা জানালেন। তখন ঝন্টু ঢাকা আর্ট কলেজে পড়েন। তাই আত্মবিশ্বাসও প্রবল। রাজ্জাক তাঁকে কাজ দিলেন। ১৯৭৪ সালে প্রথম পোস্টার আঁকলেন রংবাজ চলচ্চিত্রের। পারিশ্রমিক পেলেন ১০০ টাকা।

 

১৯৭৩ সালে নিজের নামে প্রতিষ্ঠা করেন ‘ঝন্টু আর্ট পাবলিসিটি’। এর ব্যানারে একে একে আঁকলেন মালকা বানু, অবাক পৃথিবী,এক মুঠো ভাত, জীবনসংগীত, মাটিরমানুষ, মনিহার, জয়-পরাজয়, বধূবিদায়,কথা দিলাম, রাজা -রানী, দস্যুরানী, ডাকুমনসুর, সওদাগর, রূপবান, রাখালবন্ধু,অভিযান, রাজা, মিস্ত্রি, সমাধি, নিশানসহ সাত শতাধিক চলচ্চিত্রের পোস্টার।

সর্বশেষ ২০১৪ সালে এঁকেছেন প্রাণের চেয়ে প্রিয় ছবির পোস্টার। ৪০ বছরে বিভিন্ন চলচ্চিত্রের পোস্টার দেখেছেন, অথচ ‘ঝন্টু আর্ট’ শব্দ দুটি দেখেননি এমন মানুষ বিরল। একজন পেশাদার পোস্টার আঁকিয়ের মাথায় কী করে গানের রেকর্ড সংগ্রহের ভাবনা এল? ঝন্টু বলতে লাগলেন, ‘একটা সময় ছিল যখন সবাই “কলের গানে” গান শুনত। এ যন্ত্রের কল্যাণে বিশ শতকের গোড়ার দিকে বাংলা গানের স্বণর্যুগ শুরু হয়। তার মধ্যপর্বের এক অসামান্য সুরশিল্পী কমলা ঝরিয়া। ৩০ থেকে ৫০—এই তিনটি দশক বাংলা গানের ভুবনে ছিলেন দাপুটে শিল্পী। তাঁর গাওয়া আমায় নহে গো-ভালোবাসো শুধু ভালোবাসো মোর গান...আমাকে মুগ্ধ করে। এই মুগ্ধতা থেকে তাঁর গানের রেকর্ড সংগ্রহের বাসনা জাগে। বাসনার জগৎ বিস্তৃত হতে হতে একপর্যায়ে তা নেশায় পরিণত হয়।’ চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে আবদুল মজিদ নামে এক মাইক ব্যবসায়ীর কাছে অনেক পুরোনো গানের রেকর্ড আছে। সেগুলো তিনি কাউকে দেন না। এক পরিচিত জনের মাধ্যমে এই খবর পেয়ে ১৯৬৮ সালে ঝন্টু চলে যান তাঁর বাড়িতে। বাড়ির সামনে ঝুলছে ‘মজিদ মাইক হাউস’ সাইনবোর্ড। ভেতরে ঢুকে ঘরের অবস্থা দেখে হতবিহ্বল ঝন্টু। পুরোনো এলপি, ইপি ও এসপির বিশাল এক স্তূপ।

বললেন, ‘তুমি বেছে নাও।’ ঝন্টু বলেন, ‘আমি তখন পুরো স্তূপ ওলট-পালট করে ৬০-৬৫টি রেকর্ড বেছে নিই। আব্বাসউদ্দীন, শচীনদেব বর্মন, মোহাম্মদ নাসির, আবদুল আলীম, আবদুল মজিদ তালুকদার, বেলা খান, তসের আলী, মোমতাজ আলী খান, শ্যামসুন্দর বৈষ্ণবসহ আরও বেশ কয়েকজন পুরোনো শিল্পীর গান। মনে হলো যেন যুদ্ধ জয় করেছি।’ বাড়িতে ফিরে সব রেকর্ড পানিতে চুবিয়ে ভালোমতো পরিষ্কার করেন ঝন্টু। পরে সেগুলোর গায়ে গায়ক, গীতিকার ও সুরকারের নাম লেবেল আকারে সাঁটিয়ে দেন। শুরু হলো রফিকুল হক ঝন্টুর গান সংগ্রহশালার কাজ। এখানে এখন এলপি, ইপি ও এসপি মিলিয়ে রেকর্ড আছে তিন হাজারের মতো। আর গান প্রায় ১৫ হাজার। ঝন্টুর সংগ্রহশালার একটি বড় অংশজুড়ে আছে নজরুল ইসলাম, আব্বাসউদ্দীন, আবদুল আলীম, গীতা দত্ত, নির্মলেন্দু চৌধুরী, মোহাম্মদ রফি, জগন্ময় মিত্র, মান্না দে, তৃপ্তি মিত্র, রুনা লায়লা, বিষ্ণুপদ দাস, গঙ্গাচরণ, নিতাই ঘটক, চাঁদ বড়াই, গিরিণ চক্রবর্তী ও কে মল্লিকের গান।
বেশির ভাগ গান সংগ্রহ করেছেন বিভিন্ন শহরের অলিগলি, ভাঙারির দোকান, ফুটপাতের ভ্রাম্যমাণ দোকান থেকে ও ব্যক্তিগত যোগাযোগের মাধ্যমে। যখন যার কাছ থেকে পুরোনো দিনের রেকর্ডের খবর পেয়েছেন, সেখানেই ছুটে গেছেন।ঝন্টু বলতে থাকেন, ‘এসব কিসের নেশায়, কেন করেছি জানি না। টাকা নিয়ে সন্তানের জন্য দুধ কিনতে গিয়ে ফুটপাতের ভাঙারির দোকান থেকে রেকর্ড কিনে এনেছি।’ এমন পাগলামি কেউ করে? কিন্তু ঝন্টু করেছিলেন। আর তিনি পেয়েছেন তাঁর ভাষায়, ‘অমূল্য সব সম্পদ।’