28 February 2017
g+ tw Chapaibarta Faceook Page
Chapaibarta.com


হলুদ পাঞ্জাবি: নাহিদা আশরাফী (গল্প)

Published:  18 May 2016
হলুদ পাঞ্জাবি: নাহিদা আশরাফী (গল্প)

ঘুটঘুটে অন্ধকারে- জলবিছানায় রাবু কতক্ষণ ধরে ভাসছে ঠিক মনে করতে পারছে না। জোর করে মনে করতে গিয়ে মাথায় তীব্র এক ব্যথা অনুভব করে। কিছু একটা ধরে আছে ‘ও’। মনে হচ্ছে কোন খড়ের গাদা বা এ রকম কিছু। অন্ধকারে অনুমান করাও কষ্টসাধ্য। ‘ও’ ব্যাকুল হয়ে পাশের মানুষটাকে খোঁজে। ও'র তো একা থাকার কথা না। গেল কই মানুষটা?

অনেক অনেক দুঃসময় পেড়িয়ে ও পেয়েছিলো মানুষটাকে। সবচেয়ে বড় কথা রাবু বিশ্বাস দেখেছিলো মানুষটার চোখে। সেই মানুষ ও'কে একা ফেলে যায় কি করে? চৌত্রিশ জোড়া কোকিল ডেকে ডেকে ক্লান্ত হয়েছে তবু একটা বসন্ত আনতে পারেনি রাবুর জীবনে। অথচ  কোন এক ঘোর বাঁধভাঙ্গা বরষায় মানুষটা নিজেই এসে জুটলো রাবুর বাড়ির উঠোনে।
"এমুন বাইস্যা! এট্টুস খাড়াই? কমলেই যামু গিয়া"। রাবু হ্যাঁ না কিছু বলেনি বটে তবে তার চাহনিতে লোকটা বোধহয় ভরসা পেয়েছিলো। না চাইতেও লোকটা টুকটাক কাজে রাবুর সাথে হাত মেলায়। ঘরের বেড়া থেকে কাপড়ের গিঁট খুলে রাবুর হাতে দেয়, টিনের উপরে শুকাতে দেয়া পুরানো ভাতগুলো নামিয়ে দেয়। কাজগুলো লোকটা এত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে করতে থাকে যে পলকেই রাবু ভুলে যায় মানুষটা তার কেউ না, দেখেওনি কোন কালে। কখন লোকটা এসে দাঁড়িয়েছিলো তাও মনে করতে পারছে না রাবেয়া এই মুহূর্তে। শুধু মনে হয়েছিলো লোকটা জনম জনম ধরে তার কাছেই আছে। শুভ কাজে তাই আর দেরি করেনি রাবু। সপ্তাহের মাথায় বিয়ের কাজটা সেরে ফেলেছিলো দুজন।

অন্ধকার নতুন কিছু নয় রাবুর জন্যে। এ অব্দি আঁধার কেটেই বাঁচতে হয়েছে তাকে। জ্ঞান ফিরে পেয়েই জীবিত না মৃত এই নিয়ে বেশ দ্বন্দ্বে ছিলো খানিকটা সময়। বেঁচে আছে সে-এই বোধটুকু কাজ করার সাথে সাথেই তার সমস্ত ইন্দ্রিয় নড়েচড়ে ওঠে, বেঁচে থাকার আকুল ইচ্ছেতে পরিণত হয়। ভাসছে সে এটা বুঝতে পারছে কিন্তু কোথায় ভাসছে কেন ভাসছে, কখন থেকে ভাসছে তা অনুমান করা অসম্ভব এই মুহূর্তে। খুব চেষ্টা করছে ভয় না পেতে, তবু এই আঁধারের সাথে রহস্যময় জলের ছলাৎ ছলাৎ শব্দ তার মধ্যে কিছু বাড়তি ভয়ের যোগান দিচ্ছে। প্রতিকুলতার সাথে যুদ্ধ করেই এগুবে এমন মনোভাবটা চাঙ্গা হতেই সে ফের সাতরাতে আরম্ভ করে। হাত পা অবস হয়ে আছে, নাড়াতে গিয়ে তীব্র ব্যথায় কঁকিয়ে ওঠে সে। মাথাটাকে দশ মণ ওজনের বোঝা মনে হয়। চোখ বুজে আসতে চায়। তবু নিজেকেই নিজে বোঝায়। এই সংগ্রামে হারতে চায় না সে।
 

বারো বছর বয়স থেকেই যুদ্ধ করে  যাচ্ছে সে। মা চলে যাবার পর পঙ্গুবাবা আর নেশাখোর ভাইটাকে আগলে রাখতে কতটা অমানুষিক কষ্ট করতে হয়েছে তাকে তা কেবল সেই জানে। শ্রম আর ঘাম বেচেও যখন কুলাতে পারেনি তখন বাধ্য হয়ে নিজেকেও বেচতে হয়েছে। দিন রাত বেচে বেচে ক্লান্ত যখন তখন হঠাৎই রাবেয়া আবিষ্কার করলো তার ভাইটির নিরুদ্দেশ হবার বিষয়টি।

নেশার টাকার জন্যে সপ্তাহ দুয়েক পর হলেও আগে আসতো বাড়িতে কিন্তু গত দেড় মাসে ভাইটার কোন খবরই পায়নি সে। এই তথ্য আবিষ্কারে রাবেয়া যে খুব ভেঙ্গে পড়েছে এমন নয়। কিন্তু এহেন পরিস্থতিতে কি করা উচিত তা বুঝে উঠতে না পেরে শেষে চুপ হয়েই থাকলো। কম তো চেষ্টা করেনি রাবু ভাইটাকে নেশার নীল জগৎ থেকে ফিরিয়ে আনতে। অত্যাচার সয়েছে, নির্যাতন সয়েছে। এমনকি ঘরের কোনা কাঞ্চি খুঁজে টাকা না পেলে নেশাখোর ভাইটার হাতে বেদম মার ও সইতে হয়েছে। এতেও শেষ রক্ষা হতো না। নেশা করে টাকা দিতে না পারায় তাকে ছাড়িয়ে আনতে নিজেকেও বর্বরদের হাতে তুলে দিতে হয়েছে বেশ কয়েকবার। রাগে, কষ্টে কয়েকবার আত্মহত্যার চিন্তাও যে মাথায় আসেনি তা নয়। কিন্তু পঙ্গু বাবাটার কথা ভেবে তাও পারেনি। ভাইটা নিরুদ্দেশ হবার এক বছরের মাথায় বাপটাও ওকে একা করে চলে গেল না ফেরার দেশে। কিন্তু ততদিনে বেলা তো কম হয়নি তার। বিয়ের আশা ছেড়েই দিয়েছিলো রাবু। কারণ জেনেশুনে কেই বা তাকে বিয়ে করবে। এমন ভাবনায় নিজেকে সান্ত্বনা দিয়ে যখন একা চলবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে ঠিক তখনই মানুষটা তার জীবনে এলো।

বাস ছাড়তেই একটু একটু শীত লাগতে লাগলো রাবুর। বাসের জানালা ঘেসে বসার সময় মানুষটা অনেকবার বারন করেছে। রাবু শোনেনি। প্রথমবার শ্বশুর বাড়ি যাবার কোন দৃশ্যই সে অদেখা রাখতে চায় না। মানুষটা কথা শোনাতে না পেরে শেষমেশ নিজের চাদরটা ও'র গায়ে জড়িয়ে দিয়েছিলো। আবেগে চোখ বুঝে রাহেলা শুধু বিধাতাকে বলেছিলো,"ইয়া মাবুদ, সবই কাইড়া নিলা। একলা একলা আর পারিনা। মরণ অবধি মানুষটারে পাশে রাইখো গো। আর কিছুই চাইমু না তোমার কাছে। "বিধাতা শুনেছিলো ও'র কথা। চলন্ত বাসে পেট্রল বোমার আগুন ছড়িয়ে পরার পরও মানুষটা ও'র হাত দুটো শক্ত করে ধরেছিলো। দাউ দাউ আগুন, চিৎকার, চেঁচামেচি, ধোয়ায় কিছুই পরিষ্কার দেখতে বা শুনতে পাচ্ছিলো না রাবু। নিয়ন্ত্রণহীন বাসটা ব্রিজের রেলিং এ ধাক্কা খেয়ে কোনমতে নিচে পড়া থেকে বেঁচে গেলেও আগুন থেকে বাঁচতে পারলো না। পোড়া মানুষের আর্তচিৎকার আর হাহাকারে আতঙ্কিত রাবু খুব শক্ত করে জড়িয়ে ধরে মানুষটাকে।
"বউরে আমারে ছাইড়া ঝাপ দে পানিতে। এমুন ধইরা থাকলে দুইজনেই মইরা যামু। ঝাপ দে বউ, ঝাপ দে।"
-মানুষটার এমন দৃঢ় কণ্ঠ শুনে রাবু অবাক হয়। নরম আর আলাভোলা স্বভাবের মানুষটার কণ্ঠেও এক সরলতা ছিলো সব সময়। আজ হঠাৎ এমন দৃঢ়ভাব কোথায় পেল কে জানে?
"আমি পারুম না। আমার ডর লাগে"
"পারবি। কুন ডর নাই রে বউ। এইখানে থাকলে আগুনে পুইড়া মরবি। ঝাপ দিলে তবু বাচনের আশা থাকবো।"
"কিন্তু...."
"কুন কিন্তু নাই রে বউ। তরে বাঁচান আমার ফরজ কাম। তাড়াতাড়ি ঝাপ দে। তুই দিলে আমি ও ঝাপ দিমু"
এরই মধ্যে আগুনে গ্রাস করে রাবুর জানালাটাও। মানুষটা জানালা দিয়ে জোর করে রাবুকে ধাক্কা মেরে নিচে ফেলে দেবার ঠিক আগ মুহূর্তে হাতটা ছাড়িয়ে নেয়। ব্রিজের উপর থেকে নীচে পড়ে যেতে যেতে পুরো বাসটাকে আগুনে তলিয়ে যেতে দেখে সে। এক মুহূর্তের জন্যে মানুষটার অসহায় চোখ দুটি ছাড়া আর কিছুই দেখতে পায়নি রাবু।

"কতক্ষণ ধইরা ভাসতাছি? আমি কি বাইচা আছি?"-নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করে রাবু। এত কষ্টেও হাসি পায় তার। সারাজীবন জীবন মৃত্যুর মাঝখানেই ঝুলে থাকলো সে। বিধাতার এই রহস্যপূর্ণ আচরনে খুব ক্ষুব্ধ রাবু। বেঁচে থাকতে শতবার মরা আর মরতে গেলে জীবনের রক্ত চক্ষু। "কই যাও? জীবনের লেনদেন হিসাব নিকাশ সব চুকাও। তারপর যাও।"রাবুর হিসাব ও মেলে না, মরতেও পারে না, বাঁচতেও পারে না। তবু মানুষটাকে পেয়ে জীবনটার প্রতি একটু মায়া মহব্বত জন্ম নিয়েছিলো। বড় অদ্ভুত রকম কথা বলতো মানুষটা। শুনলে বেঁচে থাকতে ইচ্ছা করতো রাবুর। নিজের জীবনকে একটা নষ্ট জীবন ছাড়া কিছু ভাবতো না সে। অথচ মানুষটা রাবুরে কত সম্মান দিয়ে কথা বলতো। বড় আশ্চর্য লাগতো রাবুর। বিয়ের প্রথম রাতে আগপাশ কিছু না ভেবেই রাবু বলে ফেললো,"আমারে কত মাইনসে নষ্ট করছে, ইচ্ছা মতন ভোগ করছে। এত সব জাইনা ক্যান আপ্নে আমারে বিবাহ করলেন? "মানুষটা বড় অদ্ভুত ভাবে হেসেছিলো,"বউ রে যারা তর লগে এমুন করছে তাগো তো তুই ইচ্ছা কইরা কিছু দেস নাই। না শরীর না মন। তারা জোর কইরা কাইড়া নিছে। আর আমারে তুই নিজ থাইকা ভালোবাইসা সব দিতাছোস। ব্যবধান আছে না রে? "রাবু এত জ্ঞানের কথা বুঝতো না। তবে মানুষটার সব কথা সত্য মনে হতো। তার বিশ্বাস করতে ইচ্ছা করতো।‘মানুষটা বাইচা আছে তো?’-এই চিন্তাই রাবুকে বেঁচে থাকার ইচ্ছে জাগায়। রাবু শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে হাত পা ছুড়তে চেষ্টা করে।

অইতো অইতো...নাওখান আর একটু আগাও মিয়া....ভাসতাছে... বাইচা আছে না মইরা গেছে কে জানে? তাড়াতাড়ি আগাও মাঝি...একটু একটু নড়তাছে....টর্চের তীব্র আলো, মানুষের হৈ চৈ, কিছু উৎকণ্ঠিত মুখ দেখতে দেখতে কখন যে দ্বিতীয়বার জ্ঞান হারালো রাবু জানে না। ঠিক পাঁচ দিনের মাথায় রোদ যখন বেহায়া ভঙ্গিতে উঠোনে দাঁড়িয়ে রাবু তখন একটু নড়ে চড়ে উঠলো। অনুমান করার চেষ্টা করলো কোথায় আছে। ঘড়ের চেহারা আর আসবাব দেখে যেটুকু বুঝলো গ্রামের কোন স্বচ্ছল পরিবারেই আছে সে। একটু একটু করে সব মনে পড়তে শুরু করে তার। মানুষটার কথা মনে হতেই এক অদ্ভুত শিহরনে সে তড়িৎ উঠে বসে। যে করেই হোক মানুষটাকে তার খুঁজে বের করতেই হবে। হঠাৎ একটা কোমল হাতের স্পর্শে চমকে ওঠে রাবু।
"কি লো বেটি? অহন কেমুন লাগতাছে? রাবু কি বলবে বুঝে উঠতে না পেরে চুপ করে থাকলো
"শইলে কি বল পাইতাছো একটু?"
রাবু অস্ফুটে কিছু একটা বললো। কথা বলতে গিয়ে বুঝলো কতটা দূর্বল সে।
"আইচ্ছা আমারে কই পাইলেন?
"তুমারে রাঢ়ির খাল ত্থন তিন মাইল উজানে বিরই নদীর মুখে পাইছে গো আম্মা। যখন নাওয়ে উঠায় তখন সবাই ভাবছিলো মইরা গেছো।পরে তোমার কইলজার ধুকপুক আওয়াজে বুঝছে তুমি বাইচা আছো। তিন দিন হাসপাতালে, তার বাদে বড় ডাক্তারসাব কইলো বাইত্তে নিয়া ঘুমাইতে দিলেই তুমি ঠিক হইয়া যাইবা। তখন তুমার কাকায় ভ্যানে কইরা তুমারে বাড়িত নিয়া আইলো। হ্যার নায়েই তুমার খোঁজ পাইছিলো গো আম্মা। অনেক কথা কইলাম। তুমারে খাওন দেয়া দরকার। নইলে শইলে বল পাইবা না। একটু বইসা থাকো আমি খাওন নিয়া আসতেছি। "রাবু কিছু শুনলো কি শুনলো না কে জানে। ভাবলেশহীন চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে আবার গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল। সন্ধ্যে নাগাদ রাবুর যখন ঘুম ভাঙ্গলো তখন রাবুকে বেশ ঝরঝরে লাগছিলো। বাড়ির মুরুব্বিকে এই প্রথম দেখতে পেল সে। ঘর থেকে উঠোনে পা দিতেই মুরুব্বি বলে উঠলো, "আইসো গো আম্মা। ও ময়নার মা আম্মার বসবার লাগি কিছু পাইতে দেও না"। মানে সকালে যাকে দেখেছে রাবু সে ই ময়নার মা। ময়নার মা এক গ্লাস গরম দুধ নিয়ে এলো। রাবু দুধের গ্লাস হাতে নিয়ে ময়নার মায়ের দিকে তাকিয়ে আছে ঠিক ই কিন্তু তার এক নাগারে বলা কথা কোনটাই রাবুর কানে ঢুকছে না। ওর চোখে তখন জ্বলন্ত বাস, দুটি অসহায় চোখ ঘুরপাক খাচ্ছে।

"আইচ্ছা যেই বিরিজটার উপ্রে বাসে আগুন লাগছিলো এইখান থিকা হেই বিরিজ কতদূর?" এই অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্নে বাড়ির গিন্নি কর্তা দুজনেই বুঝলেন তাদের গৃহস্থ, ঘরকন্না সম্পর্কিত কোন কথাই রাবুর কান স্পর্শ করেনি। নিজেদের তাই দ্রুত সামলে নিয়ে ময়নার বাপ রাবুর প্রশ্নের উত্তর দিলো। "বেশিদূর না গো আম্মা। আমগো বাড়ি থিকা রাঢ়িরখাল বাজার বড়জোর দুই ক্রোশ। হেই বাজারের পরই বিরিজটা। শয়তানের বাচ্চাগুলাইন বেঘোরে মরব। আহারে ক্যাম্নে তাজা পরানগুলারে এমুন কইরা পুইড়া মারলো। খবিস পিচাশের দল। তিনজন ছাড়া কেউ বাচবার পারে নাই গো আম্মা। আর দ্যাহো আল্লার কি হুকুম তিনজনই মাইয়া মানুষ।"
পরদিন সকালে থানার বড় বাবু আসে। নানা প্রশ্ন করে, রাবু কিছু দেখেছে কিনা, কিভাবে আগুন লাগলো। কয়টা নাগাদ কত কি প্রশ্ন। রাবু কিছুই মনে করতে পারছে না। এসব মনে রাখার মত পরিস্থিতি কি ছিলো তখন? ও'র শুধু মানুষটার চোখ দুটি আর হাত ছেড়ে দেবার ছবিটাই চোখে ভাসে। আর এও তো সত্যি উদ্ভ্রান্ত সময় গুলোতেই কেবল বোঝা যায় আমরা শুধু আমাদের নিজেদেরকেই ভালোবাসি। নইলে রাবুই বা কি করে পারলো এমন করে মানুষটাকে একা ফেলে নিজে ঝাপ দিতে?
"পুলিশ স্যার আপ্নে ঠিক কইরা জানেন কেউ বাইচা নাই?"
"হ্যা অবশ্যই জানি। আমাদের কাছে মৃতদেহগুলো যা আমরা উদ্ধার করতে পেরেছি তার ছবি আছে। তোমার সাথে কেউ কি ছিলো?"
"জি আছিলো। আমার... "বিরবির করে বলা কথাগুলো রাবুর কানে ঠিকমতো ঢুকলো কিনা কে জানে। পুলিশের এক ছোটকর্তা ওকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে অনেকগুলো ছবি মেলে ধরে রাবুর সামনে। মৃত মাছের চোখের মত ফ্যাকাসে দৃষ্টি নিয়ে ছবিগুলো দেখছে ঠিকই কিন্তু মনের ভেতর এক তীব্র বিশ্বাস শুকনো পাতার মত খচখচ করছে। মানুষটার ছবি এখানে দেখবে না সে। কিছুতেই না।
ছবিটা রাবু কয়েকবার দেখেছে। বাসের জানালা দিয়ে মাথা সহ এক তৃতীয়াংশ ঝুলে আছে মানুষটার শরীর। পরনের হলুদ পাঞ্জাবীটা অনেকটা পুড়ে গেছে। অবশিষ্টাংশ রাবুর হৃদয়টা পোড়াতে রয়ে গেছে।
"বউ রাগ করিস না। একখান কাম করছি"- বলেই শিশু সুলভ হাসিতে প্যাকেটটা এগিয়ে দেয়।
"ওমা! এই হইলদা রঙ্গা শাড়ি কিনলা ক্যান?"
"বউ রে শাড়িডা খুব মনে ধরছে। কাইলকা যখন তুই তর শ্বশুর বাড়ি যাইবি তখন এই শাড়িখান পিনবি। আমি ও আমার হইলদা পাঞ্জাবি টা পিন্দুম। কেমুন সোন্দর লাগবো রে তরে বউ। "রাবুর ভেতরটা শাড়ি পেয়ে যতটা আনন্দিত তার চেয়ে বেশি আনন্দিত মানুষটার ছেলেমানুষি দেখে। তবু অনেকগুলো টাকা নেমে যাবার কষ্টটাও কম লাগছে না।
"এই জন্যে এত্তগুলা টাকা খরচা করলা? তুমি যে কি না।"
আচমকা এমিন কথা শুনে কিছুটা মিইয়ে গিয়েছিলো রাবুর মানুষটা। বাচ্চাদের মত মুখ গোমরা করে বসেছিলো ঘরের দাওয়ায়। রাবু অবাক হয়ে তখন শুধু একটা কথাই ভেবেছিলো-ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র এই ঘটনা রাবুকে কি করে এতটা আনন্দে  ভাসায়। জীবনটা হঠাৎ করেই রাবুর কাছে শীত সকালের রোদের মতই মিঠে হয়ে উঠেছিলো। বিকেলের আলো মরে যেতেই শাড়িটা পড়ে মানুষটার সামনে দাঁড়ায় রাবু। এক লাফে ঘরের দাওয়া থেকে উঠে দাঁড়িয়ে চঞ্চল বাচ্চাদের মত রাবুকে জড়িয়ে ধরে।
"বউ রে তরে তো জোসনা রাইতের চান্দের মতন লাগতাছে রে। চল তরে রিক্সায় বসাইয়া সারা রাইত রিক্সায় ঘুরুম।"
"কও কি? কাইল শ্বশুর বাড়িত যামু। কত কি গুছান লাগবো।"
"আরে ধুর গুছানের লাইগা তো সারা জীবনই পইড়া আছে। এই অগুছালো কামডাই মনে থাকবো রে বউ।"

মানুষটা কি সুখে যে রিক্সা টানছিলো। দেখলে মনে হবে এর চেয়ে সুখের কাজ আর কিছু নাই। নিমতলির রাস্তায় বড় বড় বটগাছের কাছে এসে এদিক ওদিক দেখে এক টানে রাবু কে রিক্সা থেকে নামিয়ে গাছের আড়ালে নিয়ে উদভ্রান্তের মত আদর করেছে। রাবুর তখন মনে হয়েছিলো মানুষটা তার স্বামী না প্রেমিক।

রাবুর শরীরের ভাজ পরতে পরতে খুলে গিয়েছিলো মানুষটার শরীরী আহ্বানে।এক অদ্ভুত শিহরনে কেঁপে কেঁপে উঠেছিলো রাবু সেদিন। কতক্ষণ এভাবে ছিলো মনে নেই। শরীরের ক্লান্তি আর বুকের ধড়ফড়ানিটা একটু কমে যেতেই ওরা ফিরে এসেছিলো। এত আনন্দ রাবু সারাজীবনেও পায় নি। অথচ আজ সেই হলুদ পাঞ্জাবীটাই কত সহজে মানুষটাকে চিনিয়ে দিল। ঘাড় থেকে ঝুলে থাকা হলুদ পাঞ্জাবীর অংশটুকু দেখে রাবুর মনে হতে লাগলো পাঞ্জাবী নয় তার তার বাদবাকি জীবনটাই বুঝি আধপোড়া হয়ে ঝুলে আছে তার সামনে।
 
ব্রিজটার একটু পরেই নদীটা খামখেয়ালি ভাবেই উলটা মোড় নিয়েছে ঠিক ঘাড় ত্যাড়া কিশোরের মত। যেন বা পণ করে নেমেছে কার ও কথা শুনবে না। জগৎ সংসারে কার ও উপরেই রাগ করতে পারেনি রাবু। আসলে কার উপরে করবে? মা, বাবা, বখে যাওয়া ভাইটার উপর না নিজের উপর? রাগ, অভিমান, কষ্ট, দুঃখ, এসব নিয়ে খুব বেশি ভাবার সময় ও কি ছিলো রাবুর? তীব্র অভাব, অনটন, হাহাকার এসব ভেবেই কূল পেত না রাবু। আজ হঠাৎ করে তার সব রাগ এই নদীটার উপর পড়ছে। কি প্রয়োজন ছিলো এমন জায়গাতেই নদীটা থাকার যার জন্যে রাবু বেঁচে গেল। আর থাকলোই যদি নদী ভরা জল কেন? আগুন থাকতে পারলো না? কি এক অজানা অভিমানে বিধাতার উপর ও রাগ হচ্ছে খুব তার। ‘একটা জীবন দুঃখের আগুন দিয়া ভরতে পারো আর একটা নদী আগুন দিয়া ভরবার পারো না?’ তবে তো আগুনের নদীতে ঝাপ দিয়ে আজ রাবু তার মানুষটার কাছে থাকতে পারতে। "হায় মাবুদ আমার সুখ তোমার ও সইলো না? তুমি ও হিংসা করলা?" বিরবির করতে করতে রাবু কখন যে ব্রিজটার নীচে এসে দাঁড়িয়েছে আর কখন যে এমন ঝুপ করে সন্ধ্যা নেমে এসেছে রাবু বুঝতেই পারে নি। বেশ শীত শীত লাগছে নদীর ঠাণ্ডা বাতাসে তবু নড়তে ইচ্ছে করছে না তার। ঠায় দাঁড়িয়ে আছে রাবু। কোথাও যাবার তাড়া নেই, ফেরার তাড়া নেই। উদভ্রান্ত রাবুর শুধু মানুষটার কাছে যেতে ইচ্ছে করে, তার ছেলেমানুষি দেখতে ইচ্ছে করে, পাগল করা আদর পেতে ইচ্ছে করে।

ঝুপ করেই আঁধার নেমে এলো চারিদিকে। অনেকটা রাবুর জীবনের মতই। নাহ এবার ফেরা উচিৎ। আশ্রয়দাতা মানুষগুলোকে চিন্তায় ফেলা ঠিক হচ্ছে না। রাবু ধীর পায়ে এগুতে থাকে। আস্তে আস্তে ব্রিজের ডান পিলারের পাশ কেটে এগুতে গিয়ে কিছু ফিসফাস শব্দে থমকে দাঁড়ায় রাবু।
"ভাসাইন্যা.... অই ভাসাইন্যা উঠ...মিকচার নে....আর ও কয় টান লাগা"
"আবে খানকিরপুত শালা চুপ থাক...আইজকা টানে হইবো না। সিরিঞ্জে পিওর মাল ভরছি...আহা কি সুখ। হেইদিন বাস জ্বালানির ট্যাকা পাইছি। নিশানা পাক্কা হইছে দেইখা নেতার কাছ থাইকা বকশিশ ও পাইছি। আইজ কয়দিন তো হেই ট্যাকায়ই চলতাছি। আইজকা আবার নিশানা মতন মারতে পারলেই হইছে। কয়দিনের মালের পয়সা হইয়া যাইবো। খিক....খিক।"

রাবুর নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিলো। রাবুর নিজের কানকে বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিলো। কি শুনছে সে? যা শুনেছে আর যা ভাবছে দুটোকে এক সূত্রে গাঁথতে চায় না সে। না কিছুতেই তার ভাবনা আর কান কে এক করতে চায় না সে। সুতো ছেঁড়া  ঘুড়ির মত যেটুকু আশাও তার জীবনে অবশিষ্ট ছিলো এই কথা গুলোকে বিশ্বাস করলে তাও আর থাকে না। রাবু স্থাণুর মত বসে রইলো কতক্ষণ নিজেও জানে না। ভাসান- আহা মা কত কষ্টে তার ছেলের নাম রেখেছিলো ভাসান। যেবার ভাইটা হয় সেবার বন্যায় ভাসতে ভাসতেই তারা গ্রাম ছেড়ে উঠে এসেছিলো শহরে। মা তাই নাম রেখেছিলো ভাসান। সেই ভাসানই আবার জীবনের কানাগলিতে ভাসতে ভাসতে ভাসাইন্যায় রুপান্তরিত হয়েছিলো। সেই বখে যাওয়া নিরুদ্দেশ ভাই কে একটা পিচাশের রুপে দেখতে হবে, সেই ভাই-এর ছুড়ে দেয়া আগুনেই তার জীবনটা এমন করে পুড়ে যাবে- এই বিভৎস গল্পটিও তার জীবনে আসা খুব কি প্রয়োজন ছিলো?
"না, এই ভাসাইন্যা আমার ভাই হইবার পারে না। এ নিশ্চয় অন্য কোন ভাসাইন্যা। "---এই শেষ আশাটুকু সঙ্গী করে খুব ধীর পায়ে ছায়ামূর্তি গুলোর দিকে এগিয়ে যায় রাবু। নেশায় চুড় হয়ে থাকা প্রথম ছায়ামূর্তির দিকে চোখ পড়তেই রাবুকে আর এগুতে হয় নি। শীতের মরা পাতা যেমন বাতাসের হালকা ঝাপটায় ঝরে পড়ে রাবুর শেষ আশাটুকু তেমনি প্রথম ছায়ামূর্তির দিকে চোখ পড়তেই ঝরে গেল। না এই ভাসান তাকে খুশীতে ভাসায় নি, দুঃখ, হতাশা আর গ্লানির অতল সাগরে তলিয়ে দিয়েছে। তলিয়ে যেতে যেতে রাহেলা বুকের ভেতরে হাতরে ফেরে সেই ছয় বছর বয়সী মা হারা ভাইটার মুখ। সেই অসহায় মুখটির প্রতি যতটা মায়া ঠিক ততটাই ঘৃণা তার সামনে অচেতন পড়ে থাকা এই ছায়ামূর্তিটার জন্যে। যে ভাইয়ের জন্যে একদিন সব হারিয়েছিলো সেই ভাইয়ের ছুড়ে মারা বোমায় ঝলসে গেছে তার অনেক ত্যাগে পাওয়া সাজানো বাগান। এ টকুই বোধকরি বাকী ছিলো জীবনের নির্মম হিসাব নিকাশের। সিদ্ধান্ত নিতে খুব বেশি সময় নেয় নি রাহেলা। ঘা খাওয়া পোড়া খাওয়া মানুষগুলো পরিস্থিতি বুঝে খুব দ্রুত সিদ্ধান্ত নেবার অদ্ভুত ক্ষমতা নিয়ে জন্মায়। খুব সাবধানে রাহেলা নেশায় ডুবে থাকা মানুষদুটির পাশ কেটে এগিয়ে যায় এলোমেলো পড়ে থাকা কিছু বোতল, দেশলাই আর বোমা তৈরির সরঞ্জাম এর দিকে। কয়েকটা বোতল থেকে গন্ধ শুঁকে কেরোসিনের বোতলটা ঠিক বেছে নেয় সে। অবাক গ্রামবাসী মধ্যরাতে তিনটে জলন্ত মানুষকে উদ্ধারে এগিয়ে আসতে আসতে সব শেষ।

পুড়ে যেতে যেতে রাবুর তেভরে এক অন্য রকম স্বস্তি কাজ করছিলো। ভাইকে পিচাশ জীবন থেকে বাচানোর স্বস্তি, তার নিজের মানুষটার কাছে যাবার আনন্দ, জীবনের লেনদেন চুকানোর তৃপ্তি। রাবু বুঝে গিয়েছিলো বেঁচে থাকা যতটা কষ্টের তার চেয়ে মরে গিয়ে বেঁচে যাবার আনন্দ অনেক। মন তো আগেই পুড়েছিলো। মন পোড়া মানুষের শরীর আগুন আর কতটা পোড়াতে পারে।

সর্বশেষ খবর