28 April 2017
g+ tw Chapaibarta Faceook Page
Chapaibarta.com
নাটোর চলনবিলের ১৫'শ হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে গেছে

নাটোর চলনবিলের ১৫'শ হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে গেছে

নাটোরঃ হঠাৎ উজান থেকে নেমে আসা ঢলের পানিতে জেলার চলনবিলে তলিয়ে গেছে প্রায় ১৫'শ হেক্টর জমির পাকা-আধাপাকা ধান। চোখের সামনে কষ্টের ফসল পানির নিচে তলিয়ে গেলেও কিছুই করতে পারছে না কৃষকরা।শুধু বোরো ধান নয়, অসময়ের পানিতে বাদাম, ভুট্টা সহ অন্যান্যে ফসল পানিতে ডুবে গেছে।

এদিকে, তীব্র শ্রমিক সংকটের কারণে পাকা ধানগুলো ঘরে তুলতে পারছেনা কৃষকরা। যে কয়জন শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে তাদের পারিশ্রমিকও তিনগুণ। তবে কৃষি বিভাগ জমির ৮০ শতাংশ ধান পেকে গেলেই কর্তন করার পরামর্শ দিচ্ছেন।

এদিকে, গত দুই দিনের চেষ্টায় উপজেলার বখতিয়ারপুর রেগুলেটর এবং জোড়মল্লিকার ব্রিজের নিচে বাধ দিয়ে পানি বাধা দেওয়ার চেষ্টা করছে কৃষক এবং উপজেলা প্রশাসন।

তবে চলনবিলের কৃষকদের অভিযোগ, সিংড়া উপজেলার বিলদহর এলাকার একটি মাটির বাধ প্রভাবশালীরা সূতি জাল দিয়ে মাছ ধরার লোভে কেটে দেওয়ার কারণে এবার হঠাৎ করেই চলনবিলে পানি প্রবেশ করেছে।

ভুক্তভোগী কৃষক এবং উপজেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, উজান থেকে আত্রাই নদী দিয়ে নেমে আসা পানির কারণে বিভিন্ন নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পায়। যার কারণে হঠাৎ করেই চলনবিলের চৌগ্রাম, শেরকোল, চামারী, তাজপুর, কলম, ডাহিয়া এই ৬টি ইউনিয়নের বেশির ভাগ ফসলি জমির মাঠ তলিয়ে গেছে। এখন পর্যন্ত ১৫'শ হেক্টর জমির ধান নিমজ্জিত রয়েছে।

সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, সিংড়ার পাটকোল, চলনবিলের বিলদহর, কৃষ্ণনগর, ডাহিয়া, বেড়াবাড়ি, নূরপুর, কলম, কাউয়াটিকরি সহ গুরুদাসপুর এবং তাড়াশ উপজেলার অর্ধলক্ষাধিক কৃষকের স্বপ্ন এখন পানির নিচে।

কিছু কিছু জমির ধানের শিষ পানির সাথে হাবুডুবু খাচ্ছে। এছাড়া বেশির ভাগ জমির বাদাম এবং ভুট্টা তলিয়ে গেছে। পাটকোল ব্রিজের নিচ দিয়ে হঠাৎ করেই পানি প্রবেশ করায় অন্তত ১০০ হেক্টর জমির কাচা পাকা ধান পানিতে নিমজ্জিত।

কিছু কিছু জমির মালিক নিজেরাই শেষ সম্বল টুকু উদ্ধারের জন্য প্রাণপন চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। কেউ আবার ধান কেটে রাস্তার ওপর নিয়ে আসছে। এছাড়া চলনবিলে দলে দলে শ্রমিকরা ধান কেটে পানিতেই ফেলে রাখছে। কেউ আবার নৌকা করে ডাঙ্গায় নিয়ে আসতে ব্যস্ত সময় পার করছে।

কথা হয় পাটকোল গ্রামের আব্দুর রাজ্জাকের সাথে। তিনি বলেন, একদিনের বানের পানির কারণে এবার তার ১১বিঘা জমির ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। চোখের সামনে ধান তলিয়ে গেলেও কিছুই করতে পারিনি।

প্রতি বিঘা ৮ থেকে ১০হাজার টাকা খরচ হলেও একটাকার ধানও ঘরে তুলতে পারিনি। বন্যার পানিতে সব শেষ হয়ে গেছে। এখন পথে বসার উপক্রম হয়েছে।

আরেক কৃষক সোলায়মান আলী বলেন, বিভিন্ন এনজিও এবং ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে জমি চাষ করেছিলাম। কিন্তু হঠাৎ করে গত দুই দিনের পানিতে সব শেষ হয়ে গেছে। এখন এনজিও এবং ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করবো কি করে।

চলনবিলের বিলদহর বাজারের কৃষক কাদের মন্ডল বলেন, এবার মোট ৩২বিঘা জমিতে বোরো ধানের চাষ করি। কিন্তু হঠাৎ পানি আসার কারণে বেশির ভাগ জমির ধান তলিয়ে গেছে। তাছাড়া শ্রমিক সংকটের কারনে ঠিকমত ধান কাটাও সম্ভব হচ্ছে না। বেশি দরে কিছু শ্রমিক নিয়ে ২০বিঘার মতো জমির ধান কাটা হয়েছে।

কৃষ্ণনগর গ্রামের কৃষক আবু সাইদ এবং মজিবর রহমান বলেন, দীর্ঘ ৩২বছর পর চলনবিলে এমন দুর্যোগ নেমে আসলো। হঠাৎ এই দুর্যোগের কারণে কৃষকরা এখন দিশেহারা হয়ে পড়েছে। স্থানীয় কৃষি বিভাগ থেকেও সঠিক কোনো নির্দেশনা পাওয়া যাচ্ছে না। অনেকেই কাচা ধানও কাটছে। কিন্তু সে সব ধান কেটে কোনো লাভ নেই।

চলনবিলের কালিনগর গ্রামের মমেনা খাতুন নামের এক কৃষক বলেন, এবার ২০বিঘা জমিতে বোরো ধান রোপন করি। কিন্তু দেখতে দেখতে পানিতে সব তলিয়ে যাচ্ছে। আগে ধান কাটা যে শ্রমিকের মূল্য ছিলো আড়াই থেকে তিনশত টাকা এখন সেই কৃষকের মূল্য ৭'শ থেকে ৮'শ টাকা। তারপরও উচ্চ পারিশ্রমিক দিয়ে ধান কাটতে হচ্ছে। যে টুকু ঘরে আসে এখন সে টুকুই লাভ।

এদিকে, চলনবিল সহ বিভিন্ন বিলের বোরো ধান ঘরে তুলতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং করা হচ্ছে। আর কৃষি বিভাগ বলছে, জমির ৮০ভাগ ধান পেকে গেলেই তা কাটার জন্য পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছে তারা।

এবিষয়ে সিংড়া উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা শারমিন সুলতানা বলেন, চলনবিলের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে পানি প্রবেশের কারনে কিছু জমির ধান তলিয়ে গেছে। যারা এখনও ধান ঘরে তুলতে পারেনি, তাদেরকে ধান কাটার জন্য পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।এবার চলনবিলে ৩৭হাজার ২'শ হেক্টর জমিতে বোরো ধানে চাষ হয়। তবে এখন পর্যন্ত ৬ হেক্টর জমির বোরো ধান ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে।

সিংড়া উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মাদ নাজমুল আহসান বলেন, উপজেলার ৬টি ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি মাঠের ফসল তলিয়ে গেছে। এখন পর্যন্ত উপজেলার সাড়ে ৩'শ হেক্টর জমির ধান নিমজ্জিত রয়েছে।

তিনি আরো বলেন, চলনবিলের শেরকোল মাঠ, জোড়মল্লিকা মাঠ সহ বিভিন্ন মাঠের ফসল রক্ষার জন্য ব্রিজের নিচে জরুরিভাবে বাধ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া বখতিয়ারপুরের রেগুলেটর দিয়ে পানি প্রবেশ বন্ধ করা হয়েছে।

সিংড়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলাম শফিক বলেন, আকস্মিক বর্ষণ এবং ঢলের পানিতে উপজেলার ৫টি ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামের ফসল ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। এখন পর্যন্ত ১'’শ হেক্টর জমির ধান তলিয়ে গেছে। এবিষয়ে জনপ্রতিনিধিসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগ ফসল রক্ষায় একযোগে কাজ করে যাচ্ছে।

এ বিভাগের আরও খবর