ম্যারাডোনার কান্না

  • Date: April 11, 2018
  • cat
  • | Post By: চাঁপাই বার্তা.কম (M)

১৯৯০ বিশ্বকাপের ফাইনালের কোন্ স্মৃতিটা আসলে কার মনে গেঁথে আছে কে জানে। এই যে ছবিতে দেখা যাচ্ছে আন্দ্রিয়াস ব্রেমে গোল করছেন। সার্জিও গয়কোচিয়া ব্যর্থ হচ্ছেন। ৫ মিনিট পর শেষ বাঁশি বাজলে ডিয়েগো ম্যারাডোনার কান্নার ছবিটা তো কোটি কোটি মানুষের বুকে আমৃত্যু পোস্টার হয়ে আছে। জটিল ফাইনাল। বাজে ফাইনাল। রেফারিং কেলেঙ্কারির ফাইনাল। আরো কতোভাবে বলা যায় রোমের সেই শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচটাকে। শুধু বলা যায় না, সত্যিকারের বিশ্বকাপ ফাইনাল। ব্রেমের নেওয়া পেনাল্টি কিকের একমাত্র গোলেই সেবার বিতর্কিত জয় পশ্চিম জার্মানির। সেই ছবি আজ বিশ্বকাপ ইতিহাসের ১০০ সেরা ছবির আয়োজনে। ২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপের কাউন্টডাউনের এই উৎসব। ধারাবাহিকভাবে লিখে চলেছেন খাইরুল আমিন তুহিন।

১৯৮৬ মেক্সিকো বিশ্বকাপের ডিয়েগো ম্যারাডোনা, ফাইনাল, আর্জেন্টিনার দ্বিতীয়বার বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়া বিশ্বকে রীতিমতো দোলা দিয়েছিল। শত্রুকেও ম্যারাডোনার খেলা মিত্র বানিয়ে ছেড়েছিল। বিশ্ব ইতিহাসের সেরা ফুটবলারের ম্যাজিকে মুগ্ধ ছিল ধরণী। সেবার ফাইনালে পশ্চিম জার্মানিকে হারিয়েই চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল আর্জেন্টিনা। কিন্তু ঠিক চার বছর পর কি অসহায় এক ফাইনাল চেয়ে চেয়ে দেখেন ম্যরাডোনা! জিনিয়াস মানতে পারেন না। বুক ভাঙে। আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ ফাইনাল ইতিহাসের অন্যতম দুর্বল খেলা উপহার দেয়। তবু জিততে ঘাম ছুটে যায় লোথার ম্যাথাউসদের জার্মানির।

৮ জুলাই, ১৯৯০। ১৯৮৬ বিশ্বকাপ ফাইনালের রিপ্লে রোমের স্তাদিও অলিম্পিকোতে। ইতালির রাজধানী এবং সবচেয়ে বড় শহরে। চতুর্দশ বিশ্বকাপের ফাইনাল। প্রথমবারের মতো যেখানে দুই দলের একটি গোল করতে পারে না। এবারই প্রথম অ-উইরোপিয় দলের বিপক্ষে বিশ্বকাপের ফাইনাল জেতে উয়েফার কোনো দল। মেক্সিকোতে আগের আসরে ৩-২ গোলে হারিয়ে উৎসব করেছিলেন ম্যারাডোনারা। ম্যাথাউসরা চার বছর পর নেন প্রতিশোধ। পশ্চিম জার্মানির ওটাই ছিল শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচ। অবিভক্ত জার্মানি হওয়ার আগে অবশ্য আরো তিনটি ম্যাচ খেলেছিল পশ্চিম জার্মানরা।

এই ফাইনালের আগের ১৩টিতেও হয়তো বাজে ফাইনাল ছিল। কিন্তু রোমের কারো তা মনে থাকার কথা না। ম্যাচ শেষ হওয়ার ৬ মিনিট আগে জার্মানরা সন্দেহজনক এক পেনাল্টি পায়। ১-০ তে জয় ওখানেই। বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে কম গোলপ্রসবা ফাইনাল ওটি। আর্জেন্টিনা দল সাসপেনশন ও ইনজুরির কারণে ঠিকঠাক একাদশই নামাতে পারেনি খেলাটিতে। তার ওপর ম্যাচ শেষ করতে হয়েছিল তাদের ৯ খেলোয়াড় নিয়ে। আসলে তারা চেয়েছিল কোনোমতে খেলাটিকে পেনাল্টি শ্যুট আউটে নিয়ে যেতে। জার্মানদের জাল লক্ষ্য করে ম্যারাডোনাদের পুরো ম্যাচে শট ছিল মোটে একটি। সেখানে জার্মানি ২৩ শটের মধ্যে ১৬টি রেখেছিল লক্ষ্যে। এখানেই বোঝা যায় সব।

এই আসরের আগে আসলে কখনো বিশ্বকাপের ফাইনালে সেন্ড অফ বা লাল কার্ডের ঘটনাই ঘটেনি। সেখানে এক ফাইনালেই দুটি! মিডিয়ায় আগেই বিতর্কিত মন্তব্য করেছিলেন ম্যারাডোনা। নাপোলির রাজার সেই কথা শুনে ইতালিয়ানরা আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে দুয়ো দিচ্ছিল তাদের খেলোয়াড়রা বল পেলেই। কিন্তু এই ম্যাচের সবচেয়ে দুর্বল দিক ছিল আসলে রেফারিং। আদ্যপান্ত বিতর্কিত। মেক্সিকান রেফারি ইদগার্দো কোদেসাল একের পর এক বাজে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। এই ফাইনালের সূত্রে তিনি পরে নেতিবাচক অর্থে হলেও পেয়েছিলেন সুপারস্টারের মর্যাদা।

জার্মান দলকে প্রথম পেনাল্টি দিলেন না কোদেসাল। পরে জার্মান অধিনায়ক ম্যাথাউস ফাউল করলেন গ্যাব্রিয়েল কালদেরনকে। কোডেসাল পেনাল্টি দিলেন না। এরপর পেদ্রো মনজন সেই দুর্ভাগা যে বিশ্বকাপের ফাইনালের ইতিহাসে প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে লাল কার্ড দেখেন। ইয়ুর্গেন ক্লিন্সমানকে ভয়ঙ্কর ট্যাকল করেন মনজন। সরাসরি লাল কার্ড। ওই ফাউলে ক্লিন্সম্যানের শিনে ৬ ইঞ্চি ক্ষত তৈরি হয়েছিল। তারো আগে গুস্তাফো দেজোত্তিকে সতর্ক করা হয়েছিল। ম্যাচের পড়ন্ত বেলায় তাকেও সরাসরি লাল কার্ড দেখতে হলো। ইয়ুর্গেন কোলারকে বাজে ফাউল করলেন। ওটাকে পেশাদার রেসলারদের আক্রমণের মতো মনে হয়েছিল। তবে দেজোত্তি লাল কার্ড দেখলে আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা ঘিরে ধরেন কোদেসালকে। কাজ হওয়ার নয়।

শেষ বাঁশি বাজলে ম্যারাডোনা কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন। কাঁদতে কাঁদতে এলোমেলো ঘুরছিলেন মাঠে। বলেছিলেন, রেফারিই তাদের হারিয়ে দিয়েছেন ইচ্ছে করে।

তবে ফাইনালের সেই মহা বিতর্কিত মুহূর্তটি আসে ৮৫ মিনিটে। পশ্চিম জার্মানিকে পেনাল্টি দেন কোদেসাল। রবার্তো সেনসিনি ফাউল করেছিলেন রুদি ফোলারকে। আর্জেন্টিনা দল রেফারির সিদ্ধান্তে তীব্র প্রতিবাদে ফেটে পড়ে। যথারীতি কাজ হওয়ার নয়। ম্যাথাউস পেনাল্টি নিতেন। কিন্তু আগের একটি দুঃস্মৃতি ছিল। সেজন্য নাকি নয়। জার্মান নেতা বলেছিলেন, তার বুটে সমস্যা থাকায় তিনি আন্দ্রিয়াস ব্রেমেকে পেনাল্টি শট নিতে বলেন। গোলকিপারের ডান দিকে ব্রেমের বাঁ পায়ের নিচু শটে বল ছুটে যায়। বিশ্বসেরা গোলকিপার গয়কোচিয়া ঝাঁপিয়েও শেষ রক্ষা করতে পারেন না।

জার্মানি আবারো চ্যাম্পিয়ন। আর্জেন্টিনা শিরোপা হারায়।

এই বিভাগের সর্বশেষ খবর