চাঁপাইনবাবগঞ্জ ১ আসনে ভোটের মাঠে ‘বিএনপি ও জামায়াত’ সুযোগ নিতে চায় আ’লীগ

বার্তা ডেস্কঃ আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১ (শিবগঞ্জ) আসনে সম্ভাব্য প্রার্থীদের তোড়জোড় শুরু হয়ে গেছে। এরই মধ্যে একাধিক প্রার্থী সংবাদ সম্মেলন করে একাদশ সংসদ নির্বাচনে নিজেকে প্রার্থীও ঘোষণা করেছে। তারা নির্বাচনী মাঠও গরম করার চেষ্টা করছেন। তৃণমূল নেতাকর্মীসহ সাধারণ ভোটারদের সঙ্গেও যোগাযোগ বাড়িয়েছেন। লবিং চলছে কেন্দ্রের সঙ্গেও। ভোটারদের খোঁজখবর নিচ্ছেন, শোনাচ্ছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১ আসন নিয়ে তাদের উন্নয়ন-পরিকল্পনার কথা। অনেকে ফেসবুকেও সরব রয়েছেন। এ আসনে ভোটের মাঠে বিএনপির সঙ্গে জামায়াতও প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে এবং তারা মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। শেষ পর্যন্ত যদি জামায়াত অনড় থাকে এবং আ’লীগ একক প্রার্থী নিয়ে মাঠে নামতে পারে, তাহলে সুবিধা পাবে আওয়ামী লীগ। কেননা শাসক দলটির ৪ জন প্রার্থী মাঠে নেমে পড়েছেন।

সুস্বাদু আমের জন্য এলাকাটি বিখ্যাত। দুঃসহ স্মৃতিবিজড়িত পল্লী বিদ্যুৎ আন্দোলনের সূতিকাগার কানসাটের অবস্থানও এ আসনে। দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম স্থলবন্দর সোনামসজিদসহ শিবগঞ্জ উপজেলার ১৫টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১ আসনে ভোটের হিসাবে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জামায়াতের অবস্থান প্রায় সমান সমান। স্বাধীনতার পর এ আসনে আ’লীগ ও বিএনপির প্রার্থীরাই এমপি হয়েছেন। ‘ভোটব্যাংক’ থাকার পরও এমপি হতে পারেননি জামায়াতের কোনো প্রার্থী। ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আ’লীগের ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ এনামুল হকের জয়লাভের আগে আসনটি ছিল বিএনপিরই। বিশেষ করে নব্বইয়ের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ৫ম, ৬ষ্ঠ, ৭ম ও অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসন থেকে এমপি হন বিএনপির শাহজাহান মিঞা। বিএনপির এই ঘাঁটিতে এনামুল হকের বিজয় বড় আলোচনার জন্ম দেয়। জেলা আ’লীগের সাবেক সভাপতি ব্রিগেডিয়ার (অব.) মোহাম্মদ এনামুল হককে পুরস্কার হিসেবে দেয়া হয় বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব। দশম সংসদ নির্বাচনে শারীরিক অসুস্থতার জন্য মনোনয়ন না চাইলেও এবার তিনি মাঠে নেমেছেন, গণসংযোগসহ পথসভা করছেন। সবশেষ দশম সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন পেয়ে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী হন কানসাট বিদ্যুৎ আন্দোলনের নেতা গোলাম রাব্বানী। আগামী নির্বাচনেও তিনি দলের শক্তিশালী প্রার্থী। এই দুই প্রার্থী ছাড়াও আ’লীগের আরও দু’জন প্রার্থী মনোনয়ন চাচ্ছেন। তারা হলেন- জেলা আ’লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও স্বাচিপ নেতা ডা. সামিল উদ্দীন আহম্মেদ শিমুল এবং বুয়েটের সাবেক জিএস আওয়ামী লীগ নেতা প্রকৌশলী মাহতাব উদ্দীন।

বর্তমান এমপি গোলাম রাব্বানীর বিরুদ্ধে দলে বিভেদ সৃষ্টি, স্বজনপ্রীতি ও অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে দলের একাংশের। গত সাড়ে চার বছরে শিবগঞ্জে বড় কোনো উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন না করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আগামী নির্বাচনে ফের মনোনয়ন পাওয়ার আশা করছেন গোলাম রাব্বানী। তিনি বলেন, জামায়াত-শিবিরের হামলার ভয়ে এক সময় শিবগঞ্জে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা বাড়ি থেকে বের হতে পারতেন না। অনেকে মাসের পর মাস পালিয়ে থেকেছে। সেই সময় আ’লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা আমাকে এমপি বানিয়েছেন। সেই অবস্থা থেকে আমি দলকে টেনে তুলেছি, সংগঠিত করেছি। শিবগঞ্জে আজ শান্তির সুবাতাস বইছে। এলাকার ব্যাপক উন্নয়ন করেছি। আগামী নির্বাচনে আমাকে নৌকা প্রতীক দেয়া হলে আসনটি আ’লীগের দখলেই থাকবে।

২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির রায় ঘোষণার পর শিবগঞ্জে জামায়াত-শিবিরের নাশকতা ঠেকাতে ব্যর্থতার অভিযোগ রয়েছে আ’লীগের আরেক মনোনয়নপ্রত্যাশী এনামুল হকের বিরুদ্ধে। সে সময় আ’লীগের অনেক নেতাকর্মীর বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়া হয়। সে সময় তৎকালীন এমপি এনামুল হককে পাশে পাওয়া যায়নি। এ প্রসঙ্গে ব্রিগেডিয়ার এনামুল হক বলেন, সাঈদীর রায়ের পর আমি এলাকায় ছিলাম না- এটা ঠিক নয়। জামায়াতের হামলায় আহত অনেক নেতাকর্মীকে আমি ঢাকায় চিকিৎসা করিয়েছি। আমি যখন আরইবির চেয়ারম্যান ছিলাম তখন কানসাটে পল্লী বিদ্যুতের অফিস করা হয়। এই অফিস জামায়াত-শিবির পুড়িয়ে দেয়ায় তখন মানসিকভাবে চরম বিপর্যস্ত হয়ে পড়ি। আর এই সুযোগটা নিয়ে অনেকেই আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অপপ্রচার চালাচ্ছে। তিনি বলেন, বিএনপি-জামায়াতের দুর্গে আমিই প্রথম নৌকার জয় এনে দিই। আগামী নির্বাচনে নৌকার মনোনয়ন আমিই পাব। আত্মীস্বজনদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, এসব বিরোধীর প্রোপাগান্ডা। বয়সের কারণে অবসর যাবেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, রাজনীতিতে বয়স বলে কিছু নেই, কাজ করতে চাইলে করা যায়।

ডা. সামিল উদ্দীন আহম্মেদ শিমুল বলেন, বর্তমান ও সাবেক দুই এমপিই নেতাকর্মীদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় আগামী নির্বাচনে মনোনয়নের ব্যাপারে আশাবাদী। জামায়াত-শিবিরের তাণ্ডবের সময় আমি এলাকা ছাড়িনি। মেডিকেল ক্যাম্প করে এলাকাবাসীর ফ্রি চিকিৎসা ও ওষুধ নিশ্চিত করেছি। দল মনোনয়ন দিলে নির্বাচন করব।

দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার ব্যাপারে দারুণ আশাবাদী সাবেক ছাত্রনেতা প্রকৌশলী মাহতাব উদ্দীন। তিনি বলেন, দলের জন্য কাজ করছি। আগামী নির্বাচনে মনোনয়ন প্রত্যাশা করছি। তিনি বলেন, দল ক্ষমতায় থাকালেও শিবগঞ্জের কাক্সিক্ষত উন্নয়ন হয়নি। প্রমত্তা পাগলা নদী এখন মরা খাল। নদী খননের জন্য ইতিমধ্যেই পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে ডিপিপি প্রণয়নের কাজ চলছে। নির্বাচিত হলে আরও ব্যাপক উন্নয়নের পরিকল্পনা রয়েছে।

আগামী নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আসন পুনরুদ্ধার চায় বিএনপি। এ লক্ষ্যে একাধিক প্রার্থী মাঠে। চারবারের এমপি অধ্যাপক শাহজাহান মিয়া ছাড়াও বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীরা হচ্ছেন- দলের কেন্দ্রীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ শাহীন শওকত, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা বিএনপির সদস্য বেলাল-ই-বাকী ইদ্রিসী।

এ আসনে অধ্যাপক শাহজাহান মিঞাই হচ্ছেন বিএনপির কাণ্ডারি। অন্যদিকে নবম সংসদ নির্বাচন থেকে শাহীন শওকত ও বেলাল-ই-বাকী ইদ্রিসী মনোনয়ন চেয়ে আসছেন। আগামী নির্বাচন নিয়ে কথা হয় অধ্যাপক শাহজাহান মিয়ার সঙ্গে। তিনি বলেন, শিবগঞ্জ হচ্ছে বিএনপির ঘাঁটি। নবম সংসদ নির্বাচনে কারচুপির মাধ্যমে আওয়ামী লীগের প্রার্থী জয়ী হয়। তিনি দাবি করেন বিভিন্ন রাজনৈতিক মামলায় নেতাকর্মীরা জর্জরিত থাকলেও আমার নেতৃত্বে শিবগঞ্জ বিএনপি সাংগঠনিকভাবে অনেক সংগঠিত। আগামী নির্বাচনে মনোনয়ন পেলে আসনটি ফের বিএনপির দখলে আসবে। জানতে চাইলে শাহীন শওকত বলেন, দলের নেতাকর্মীরা শাহজাহান মিঞার বিকল্প হিসেবে নতুন মুখ চাচ্ছে। আমি দীর্ঘদিন ধরে দলের জন্য কাজ করছি। দলের হাইকমান্ড সার্বিক বিষয় বিবেচনা করে আমাকেই মনোনয়ন দেবে বলে আশা করছি। মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন বেলাল-ই-বাকী ইদ্রিসীও। তিনি এলাকার মোড়ে মোড়ে বিলবোর্ড টানিয়েছেন। জানতে চাইলে তিনি বলেন, শিবগঞ্জবাসী পরিবর্তন চায়। এ লক্ষ্যেই তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছি। বাকিটা দল বিবেচনা করবে।

এছাড়া চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১ আসনে শিবগঞ্জ উপজেলা পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান কেরামত আলীকে এরই মধ্যে দলীয় প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে জামায়াত। প্রকাশ্য কর্মসূচিতে না থাকলেও পর্দার অন্তরালে তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে দলটি। এর বাইরে জাতীয় পার্টি থেকে আলাউদ্দিন টিপুও দলীয় মনোনয়নের জন্য তৎপরতা চালাচ্ছেন।যুগান্তর।।

এই বিভাগের সর্বশেষ খবর