ইভ টিজিংয়ের দুষ্টচক্র থেকে মুক্তি পাক নতুন প্রজন্ম


ইভ টিজিং বলতে যেমন একটা চিত্র চোখে আসে—কিছু মেয়ে স্কুলে যাচ্ছে আর বখাটে কিছু ছেলে পথে দাঁড়িয়ে দুটো শব্দ উড়িয়ে দিচ্ছে বা শিস দিচ্ছে। বাস্তবে ইভ টিজিং বিষয়টা এত অল্পে সীমাবদ্ধ নয়। এর প্রয়োগ এতই ব্যাপক যে, ‘ইভ টিজিং’ শব্দটা পুরো ঘটনা ব্যাখ্যা করার সাপেক্ষে অনেক হালকা একটা শব্দ। আপনার অফিসে একজন নারীকে হেয় করে কিছু বললেন—সেটা ইভ টিজিং।

পুরুষ শিক্ষক নারী শিক্ষার্থীকে তুচ্ছজ্ঞান করলেন বা কোনো দায়িত্ব থেকে সরিয়ে রাখলেন—সেটাও ইভ টিজিং। বাসে মহিলা সিট খালি নেই বলে একজন নারীকে কন্ডাক্টর বাসেই উঠতে দিলেন না—সেটাও ইভ টিজিং। প্রতিদিনের এ রকম ছোট ছোট অসংখ্য ঘটনার কেতাবি নাম, ‘ইভ টিজিং’। আর এই ইভ টিজারদের বড় অংশটিই হলো তরুণ।

ইভ টিজিংয়ের শিকার হয়ে গত এক মাসেরও কম সময়ে খুলনায় ৩ ছাত্রীর আত্মহত্যার অভিযোগ পাওয়া গেছে। গত ১৩ অক্টোবর রাতে শামীম হাওলাদার শুভ ও তার সহযোগীদের নির্যাতনের শিকার হয়ে খুলনা সরকারি করোনেশন বালিকা বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী শামসুন নাহার চাঁদনি (১৩) গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন।

২৭ অক্টোবর নিজ বাড়ি থেকে বাজুয়া এসএন ডিগ্রি কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রী বন্যা রায়ের (১৮) ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেওয়ার অভিযোগ এনেছেন বন্যার বাবা অনিমেষ রায়। ৫ নভেম্বর প্রাইভেট পড়ে ফেরার পথে দাকোপের লাউডোব সরকারি এলবিকে ডিগ্রি কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী জয়ী মল্লিক (১৮) লাঞ্ছিত হওয়ায় একইদিন রাতে জয়ী কলেজ হোস্টেলে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন। এমন ঘটনা প্রায় নিত্যঘটনায় রূপান্তরিত হচ্ছে।

গত জুনে প্রকাশিত একটি গবেষণা রিপোর্টে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে গত আড়াই বছরে ‘ইভ টিজিং’ বা প্রেমের নামে ছেলেদের হাতে উত্ত্যক্ত বা হয়রানির শিকার হয়ে প্রায় ৪০ জন তরুণী আত্মহত্যা করেছেন। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের করা ওই গবেষণায় বলা হয়, উত্ত্যক্তকারীদের হাত থেকে নিজেদের রক্ষা করার কোনো উপায় না দেখেই সাধারণত ওই মেয়েরা আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। প্রকাশিত রিপোর্টটিতে বলা হয়, ২০১৫ সাল থেকে এ পর্যন্ত ৭৫৪টি ইভ টিজিংয়ের ঘটনার খবর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে, কিন্তু এসব ঘটনার বিচারের হার খুবই নগণ্য।

কখনো এটা শুধুই ছেলেদের মজা করা, আবার কখনো ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ, কখনো ছেলেদের অধিকার—এমন নানা আদলে ইভ টিজিংকে আরও শক্তিশালী করা হয়েছে। আরও একটি সমস্যা হলো, দেখা যায় একটা ছেলে সামান্য আক্রান্ত হলেও দলের সব ছেলে বের হয়ে আসে। কিন্তু একটি মেয়ে কোনোভাবে হেয় হলে, আরেকজন মেয়ে এসে তার পাশে দাঁড়ায় না। যে নিরাপদে আছে, সে নিজের গা বাঁচিয়ে সরে যায়। এমনটি না হয়ে পাশের মেয়েটি যদি গলা তোলেন, তারপরের জন… তারপরের জন… এভাবে দুজন, পাঁচজন, দশজন। যখন দশটি মেয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়াবে, ইভ টিজিং অনেক কমে যাবে।

পরিবার থেকে মেয়েদের যেভাবে শেখানো হয়—তাকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে, ছেলেদেরও কি এভাবে শেখানো যায় না। বিচিত্র কারণে পরিবারগুলো এখানে নীরব ভূমিকা পালন করে, যা এই দুষ্টচক্রকে শুধু শক্তিশালীই করে যায়। আইনগুলোও শক্তিশালী করা যায়, এগুলো প্রয়োগে আরও কঠোর করা যায়, দৃষ্টান্ত স্থাপন করা যায়। যেসব ছেলে এ কাজগুলো করছে, তাদের আলাদা করে কাউন্সেলিং করা যায়। পাঠ্যপুস্তক, গণমাধ্যম, মসজিদ, খেলার মাঠ, ঘরে এ ধরনের আলোচনা শুরু করা যেতে পারে। বাবা-মায়েরা ছেলেদের বুঝতে শেখাবে, নারীদের উত্ত্যক্ত করা অন্যায়। নারী পুরুষের চেয়ে ছোট নয়, বরং পুরুষেরই সম্পূরক। না শেখালে এই ছেলেগুলোই বা শিখবে কোথা থেকে?

মানসিকতা বদলানো খুব সহজ কাজ নয়। তবে, সম্মিলিত প্রচেষ্টায় পরিস্থিতি অনেক উন্নত করা সম্ভব। প্রয়োজন শুধু বিশ্বাস যে, পরিবর্তন আনতে হবে এবং আমাদেরই আনতে হবে।


এই বিভাগের আরও খবর

  • আমি কে?

  • খুনি

  • ‘মেয়েদের বুঝ ছেলেদের চেয়ে কম থাকে’

  • ঢাবিতে ভর্তিযুদ্ধ শুরু

  • রূপা, তুমি ক্ষমা করো না

  • ফিন্যান্স, ব্যাংকিং ও বীমা প্রথম পত্র

  • ভাইয়া, ওরা আমাকে মারবে না তো?

  • পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন তরুণরা যখন প্রবীণ হবে

  •