জাতিসংঘের নতুন প্রতিবেদনে সেনা অভিযান নিয়ে মিয়ানমারের মিথ্যাচারের আলামত


মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে সংঘটিত সেনাবাহিনীর শুদ্ধি অভিযান নিয়ে মিথ্যাচারের আলামত হাজির করেছে জাতিসংঘ। সম্প্রতি রাখাইন থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ৬৫ জন মানুষের সঙ্গে জাতিসংঘ-কর্মীদের আলোচনার ভিত্তিতে বৃহস্পতিবার এক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। মিয়ানমার ২৫ আগস্টে নিরাপত্তা চৌকিতে আরসার হামলাকে রোহিঙ্গাবিরোধী অভিযানের কারণ বললেও ওই প্রতিবেদনে দেখা গেছে এর আগে থেকেই সেখানে জাতিগত নিধনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। জাতিসংঘের ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাখাইন থেকে সব রোহিঙ্গাকে তাড়িয়ে দিতে এবং তারা যেন আর কখনও রাখাইনে ফিরতে না পারে তা নিশ্চিত করতে পরিকল্পিতভাবে সংগঠিত ও কাঠামোবদ্ধ কায়দায় সেনা-প্রচারণা ও অভিযান চালিয়েছে মিয়ানমার।
মিয়ানমার সরকার শুরু থেকেই বলে আসছিল যে গত ২৫শে আগস্ট আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির যে হামলা, তার পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবেই তারা রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করে। জেনেভায় গিয়ে এ সংক্রান্ত পেশ করেন। জাতিসংঘের সেই নতুন প্রতিবেদন অনুযায়ী রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে যেভাবে এই পুরো অভিযানটি পরিচালিত হয়েছে, তাতে তাদের মনে হয়েছে, এটি ছিল একেবারে পূর্ব পরিকল্পিত। এর পক্ষে বেশ কিছু প্রমাণও হাজির করেছে তারা। এ নিয়ে মিয়ানমার বিষয়ক জাতিসংঘের মানবাধিকার কর্মকর্তা উদ্বেগও প্রকাশ করেছেন।

২৫শে আগস্ট আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি বা আরসা মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলা চালিয়েছিল। তবে প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, তার অনেক আগেই সেখানে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী পাঠানো হয়েছিল। আগে থেকেই ১৫ হতে ২৫ বছর বয়সী রোহিঙ্গা পুরুষদের আটক করা হচ্ছিল। রোহিঙ্গাদের মধ্যে যারা রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং ধর্মীয়ভাবে নেতৃস্থানীয় তাদের আটক করা হচ্ছিল প্রথমে। পুরো রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে নানাভাবে নির্যাতন, হয়রানি, ভয়ভীতি দেখানোর মাধ্যমে একটি চরম আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করা হয়।
আর ২৫শে আগস্টে আরসার কথিত হামলার পর যে সেনাবাহিনী তাদের ভাষায় যে ‌‘‌‌ক্লিয়ারেন্স অপারেশন’ বা শুদ্ধি অভিযান শুরু করে, সেটি এত সুসংগঠিত, সমন্বিত এবং ধারাবাহিকভাবে পরিচালিত হয়েছে যে সেটি দেখেও জাতিসংঘ কর্মকর্তাদের মনে হয়েছে এটি অবশ্যই পূর্বপরিকল্পিত ছিল। রোহিঙ্গাদের গ্রামগুলো ধ্বংস করা দেখে মনে হয়নি কোন অভিযান পরিচালনার সময় সংঘাতের কারণে ধ্বংস হয়েছে। সেনাবাহিনী এবং তাদের সহযোগীরা একেবারে পরিকল্পনা করেই গ্রামগুলো জ্বালিয়ে দিয়েছে, রোহিঙ্গাদের সব সম্পদ ধ্বংস করেছে। জাতিসংঘের কর্মকর্তারা বলছেন, রোহিঙ্গাদের গ্রামগুলো এবং তাদের সব সম্পদ যেভাবে ধ্বংস করা হয়েছে সেটা দেখে তাদের মনে হয়েছে মিয়ানমার যে রোহিঙ্গাদের স্থায়ীভাবেই বিতাড়নের চেষ্টা করছে। গ্রামগুলোতে শুধু যে বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে তা নয়। সেখানে তাদের গবাদি পশু, ফসলের ক্ষেত, এমনকি বসত ভিটায় যেসব গাছপালা ছিল সেগুলো পর্যন্ত ধ্বংস করা হয়েছে।
জাতিসংঘের ওই প্রতিবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী, রাখাইনে ফিরে আসতে চাওয়া রোহিঙ্গারা যেন সেখানে আবার নতুন করে জীবন শুরু করতে না পারে, যেন নিজেদের বসতভিটাও আর চিনতে না পারে সেই উদ্দেশ্যেই এসব কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়েছে। রিপোর্টে গুরুত্ব দিয়ে উল্লেখ করা হয়েছে, রাখাইনে যে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী বলে একটি জনগোষ্ঠী ছিল, কার্যত মিয়ানমারের সেনাবাহিনী তার সমস্ত চিহ্ন মুছে ফেলতে চেয়েছে। এজন্যে তারা বিশেষ করে টার্গেট করেছিল রোহিঙ্গাদের মধ্যে যারা শিক্ষক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় নেতা – তাদের। এর উদ্দেশ্য ছিল স্পষ্টতই রোহিঙ্গাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং জ্ঞানচর্চার ঐতিহ্য – সব কিছু ধ্বংস করা।

এই রিপোর্ট যাদের সাক্ষ্যের ওপর ভিত্তি করে লেখা হয়েছে, তারা ভয়ঙ্কর সব নির্যাতনেরও বিবরণ দিয়েছেন। কিভাবে সেনাবাহিনী এসে গ্রামগুলিতে আক্রমণ চালিয়েছে, নির্বিচারে লোকজনের ওপর গুলি চালিয়েছে, বাড়িঘরে আগুন দিয়ে জীবন্ত মানুষকে পুড়িয়ে মেরেছে, মেয়েদের ধর্ষণ করেছে, তার বিস্তারিত বিবরণ আছে এতে। বেশিরভাগ মানুষ তাদের দেওয়া সাক্ষ্যে বলেছেন, যাদের গুলি করে মারা হয়, তাদের একেবারে খুব কাছ থেকে গুলি করা হয়েছে। অনেককে পালানোর সময় পেছন দিক থেকে গুলি করা হয়। খুবই বিশ্বাসযোগ্য একটি সূত্রকে উদ্ধৃত করে রিপোর্টে এক অন্ত:সত্ত্বা রোহিঙ্গা নারীকে ধর্ষণ ও হত্যারও বিবরণ আছে। ধর্ষণের পর ওই মহিলার পেটে ছুরি চালানো হয়, এমনকি তার স্তন কেটে ফেলা হয়। অনেক মেয়েকে তাদের পরিবারের সদস্যদের সামনেই ধর্ষণ করা হয়।


এই বিভাগের আরো খবর

  • ৪৩ আফগান সেনা নিহত, আত্মঘাতী বিস্ফোরণে !

  • নেপালে তীব্র হচ্ছে ভারত বিরোধিতা

  • পতুর্গালে ১৪৫ দাবানল, পুড়ছে স্পেনও

  • পৃথিবীর ৭ স্থান দেখা যাবে না গুগল ম্যাপে

  • বদলে যাবে সৌদি আরব?

  • স্পেন ও পর্তুগালে দাবানলে নিহত ৩০

  • মিয়ানমারের জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তাদের ওপর ইইউ-র আমন্ত্রণ নিষেধাজ্ঞা

  • বিশ্বের সর্বকনিষ্ঠ প্রেসিডেন্ট সেবাস্তিয়ান!

  •