খুনি


তামান্না ইসলাম: তীব্র ব্যথায় ঘুম ভেঙ্গে গেল।মনে হচ্ছে তলপেটটা কেউ ছুরি দিয়ে কেটে ফালা ফালা করে ফেলছে। “উঃ মাগো, আর পারছি না।” ব্যথার তীব্রতায় চোখে পানি চলে আসে। দাঁতের চাপে মনে হয় নিচের ঠোঁট কেটে গেছে। আমার মেরুদণ্ড বেয়ে তীব্র একটা ঠাণ্ডা স্রোত নেমে যায়, এই ব্যথা আমার চেনা। আমি চোখ বুজে ব্যথা চাপতে চাপতে প্রার্থনা করি “আবারো যেন না হয়, এ যেন আমার সেই চেনা ব্যথা না হয়।”

অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে বেড সাইড টেবিলে রাখা ল্যাম্পটার সুইচ অন্ করি। “হ্যাঁ, যা ভেবেছিলাম তাই, আমি ভাসছি রক্তের পুকুরে। আরেকটা বাচ্চা হারালাম আমি, এই নিয়ে তিন বার। আর কতো বার? ” এতো সাবধানতার পরেও কোন লাভ হল না? বুকের ভিতরে শূন্য হয়ে যায়, খাঁ খাঁ করা শূন্যতা …

তুমি কেন সেদিন ও ভাবে তাকিয়ে ছিলে? কেন আমার ভিতরটা ছিন্ন ভিন্ন করে দিলে? কী ছিল তোমার তপ্ত নিঃশ্বাসে?

আমি আজো জানিনা সেদিন দুপুরে কি হয়েছিল। আজ থেকে সাত বছর আগে। শুধু মনে আছে প্রচণ্ড বৃষ্টি হচ্ছিল। আকাশ কালো করে মেঘ করেছে। মাতাল হাওয়ায় চারিদিক এলোমেলো, পাগলের মতো উদ্দাম নাচে মেতেছে গাছ পালা। ‘ঝড় হবে নাকি?’ মাটির সোঁদা গন্ধে মন আমার আরও বেশি মাতাল।

বাড়িতে কেউ ছিল না। আমার বাবা ব্যবসার কারণে ঢাকার বাইরে। মা ও বাড়িতে নেই, বলে গেছে ক্লাবের কাজ আছে। কিন্তু আমি ঠিক ঠিক জানি মা মেরাজ আঙ্কেলের সাথে লঙ ড্রাইভে গেছে। মা যেদিন মেরাজ আঙ্কেলের কাছে যায়, সেদিন মার চোখ দুটোয় অন্য রকম আলো খেলা করে, কেমন যেন একটা উড়ু উড়ু সুখি ভাব চলে আসে। মনে হয় আলতো পায়ে এক কিশোরী নেচে বেড়াচ্ছে।

হ্যাঁ, আমার মা ডাকসাইটে সুন্দরী। নিয়মিত জিমে যাওয়া, যত্নে লালিত মাথা ঘুরানো ফিগার। সেই সাথে মাপ মতো সাজ গোঁজ, আহ্লাদ, কথার জাদু সব কিছুর অপূর্ব কম্বিনেশন। আজ সকালেও আমি মাকে ফিসফিস করে ফোনে কথা বলতে শুনেছি। মা হয়তো ভাবে আমি কিছুই বুঝি না। আসলে, আমি এগুলো নিয়ে এখন আর একদম মাথা ঘামাই না। আমার বৃষ্টি আছে, আকাশের কালো মেঘ আছে, কৃষ্ণচূড়ার লাল আছে, নাচ আছে আর আছ তুমি। হ্যাঁ রবিদা তুমি আমার সব, আমার পৃথিবী।

হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার মতো বৃষ্টির ছন্দ সেই সর্বনাশী দুপুরে আমাকে ছাদে নিয়ে গিয়েছিল। আমি তন্ময় হয়ে ভিজছি, আপন মনে নাচছি বৃষ্টির রুম ঝুম তালে। এই ছাদটা আমার খুব প্রিয়, আমার স্বপ্ন বিলাসের নিভৃত কোন। একান্ত আমার জগত। এখানে এলে আমি সব ভুলে যাই, বাবা, মা, শুধু থাকি আমি, আর সেই আমার আমির সঙ্গী হয় প্রকৃতি, মাঝে মাঝে তুমিও উঁকি ঝুঁকি দাও মনের কোণে। সেদিন আমার হঠাৎ খুব নাচতে ইচ্ছা হল, নিজের মনে নাচছিলাম বৃষ্টির মাঝে। এতোই নিজের মাঝে মেতে ছিলাম টের পাই নি কখন তুমি পায়ে পায়ে উপরে উঠে এসেছ। জানি না কতক্ষণ তুমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমার নাচ দেখেছ। হঠাৎ এক পাক ঘুরতেই নিজেকে আবিষ্কার করলাম তোমার দুবাহুর মাঝে। আর আবিষ্কার করেই কি লজ্জা, সেই সাথে অন্য রকম এক ভালো লাগা।

“তুমি কেন সেদিন ও ভাবে তাকিয়ে ছিলে? কেন আমার ভিতরটা ছিন্ন ভিন্ন করে দিলে? কী ছিল তোমার তপ্ত নিঃশ্বাসে? ” আমি এমন কিছু একটা টের পাচ্ছিলাম নিজের ভেতর, যার সাথে আমার পরিচয় নেই। “সেট কী ছিল রবি দা?” “আমি জানি না, শুধু জানি একটা প্রচণ্ড, তীব্র চাওয়া যেটা রোধ করার ক্ষমতা আমার নেই।” “আমি শুধুই অবশ হয়ে যাচ্ছিলাম। আমার মন বলছিল আজ ভয়ঙ্কর কিছু একটা ঘটবে, এই সর্বনাশী ঝড়ের মতই। ভয়ঙ্কর কিন্তু সুন্দর, ভয়ঙ্কর সুন্দর।”

ছাদের চিলে কোঠাটা, যেটা ছিল আমার গল্পের বই পড়ার একান্ত ঘর, আমি কি সেদিন দুহাত ধরে তোমায় টেনে নিয়ে গিয়েছিলাম সেখানে, নাকি তুমি নিয়ে গিয়েছিলে আমাকে? সেদিন আমরা দুজনেই কি নেশাগ্রস্থ ছিলাম রবিদা? নেশার ঘোরে কী ঘটে গেল? সে এক ভয়ঙ্কর সুন্দর স্বপ্ন নাকি দুঃস্বপ্ন? জানি না সেদিন কোথায় ছিল আমার তীব্র নীতিবোধ, আমার তো একটুও মন খারাপ হয় নি, বরং উল্টা হয়েছে, এক তীব্র অজানা সুখে কানায় কানায় ভরে গেছে মন। আমি সেদিন তোমার হয়েছিলাম, পুরোপুরি তোমার। সেদিন কোন কথা হয় নি আমাদের, বৃষ্টির মাঝেই ভিজতে ভিজতে চলে গেলে নেশায় বুঁদ হয়ে থাকা তুমি।

তারপরের দিন গুলোর কথা আমি ভাবতে চাই না এ জীবনে। প্রতিটা দিন, প্রতিটা ঘণ্টা কী ভয়ানক দুশ্চিন্তা, সেই প্রথম জীবনে বুঝতে পেরেছিলাম লুকানো পাপের বোঝা বয়ে বেড়ানো কী এক ভয়ঙ্কর শাস্তি। প্রেগ্নেন্সি টেস্টের কথাটা প্রথম তোমার মাথাতেই আসে। রিপোর্টটা হাতে নিয়ে পাথর হয়ে গিয়েছিলে তুমি। আর আমি? ভয়ে কাঁদতেও ভুলে গেছি। সেদিন তোমার যে চেহারা আমি দেখেছি, সেরকম আমি আগে কখনই দেখি নি।

“তিথি এটা ইমোশনের সময় না। আমাদেরকে শক্ত হয়ে ডেসিশন নিতে হবে। সামনে আমাদের দুজনের সারাটা জীবন পড়ে আছে।”
আমি শূন্য চোখে তাকিয়ে ছিলাম তোমার দিকে, আমি নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছি না।
“তুমি কী বলছ আমি বুঝতে পারছি না। তুমি কি আমাকে আমার নিজের সন্তানকে খুন করতে বলছ?”

ঠাণ্ডা গলায় তুমি বলেছিলে “এটা এখন শুধুই ছোট্ট একটা রক্ত পিণ্ড, একে সন্তান বলা ঠিক না। তাছাড়া আমি এখনো ছাত্র। বাবা রিটায়ার্ড। তোমাকে পড়িয়ে যে টাকা পাই, সেটা দিয়ে আমার নিজের পড়ার খরচ চালাতে হয়। তুমি তো সবই জানো। তাহলে তুমিই বল এছাড়া তো আর আমাদের কোন পথ নেই। একটা ছোট্ট ভুলের জন্য দুজনের জীবন নষ্ট করার কোন মানে হয় না। আজকাল এগুলা কোন ব্যাপারই না।” তুমি শেষের বাক্যটি খুব জোর দিয়ে বললে, যেন তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিলে ব্যাপারটা। তুমি জানলেও না সেই এক তুড়িতে তুমি উড়িয়ে দিলে আমার বিশ্বাস, আমার স্বপ্ন, আমার ভালবাসা সব ।
আমি কিছুই বলতে পারি নি, শুধু বলেছিলাম “ছিঃ”।

সেই শেষ দেখা। কিন্তু কই? আমি কী পেরেছিলাম নিজেকে সেই ঘৃণার হাত থেকে বাঁচাতে। পারিনি।দুদিন পর হসপিটাল থেকে বেড়িয়ে যখন বাড়ি আসছিলাম নিজের ভিতরে কী শূন্যতা, কী হাহাকার। খালি মনে হচ্ছিল কে যেন নেই, আমার খুব কাছের কে যেন নেই। সেদিনও তীব্র ব্যাথা হচ্ছিল। যে ব্যথার খবর আমার আগে জানা ছিল না, কিন্তু তার চেয়েও অনেক বেশি ব্যথা হচ্ছিল আমার বুকের মাঝে। আমি একা হয়ে গেলাম এই পৃথিবীতে, একদম একা।

আমার বুদ্ধিমতী, আধুনিকা মা কিছু একটা ঠিকই আঁচ করতে পেরেছিলেন। সুকৌশলে মেরাজ আঙ্কেলের সাহায্যে বছর দুয়েকের মধ্যেই হাসানের সাথে আমার বিয়েটা সেরে ফেললেন। মধ্যবিত্ত পরিবারের সাদাসিধে ছেলে হাসান এই বিপুল বিত্ত বৈভবকে পায়ে ঠেলতে পারে নি। বড়লোক শ্বশুর বাড়ি, সুন্দরী বউ, আর কী চাই? হোক না সে প্রাণহীন। আমি যে প্রাণহীন সেটা বোধহয় সে বুঝতেও পারে না। জানি নে সেও কোন অজানা নেশায় মেতে আছে নাকি।

বিয়ের পর থেকেই একটা বাচ্চার জন্য পাগল হয়ে গিয়েছিলাম আমি। হাসান খুব অবাক হয়েছিল “এতো তাড়া কিসের? মেয়েরা তো এখন শুনি বছর পাঁচেকের মধ্যে কোন ঝামেলায়ই জড়াতে চায় না।”
ওকে কেমন করে বুঝাই যে গত দুই বছর প্রতিটা রাতে আমি ঘুমাতে গেলে একটা শিশুর কান্না শুনি। শিশুটা ছেলে না মেয়ে আমি জানি না, সে খালি খুব অস্পষ্ট ভাবে বলতে থাকে “মা তোমার কোলে উঠবো। কবে আমাকে কোলে নেবে মা? মা, আমার কী দোষ ছিল? আমি কেন তোমার কোলে যেতে পারলাম না? ”

নিজেকে জোর করে আমার প্রাণহীন দেহটা আমি প্রতি রাতে ওর হাতে তুলে দেই। “আমার কেন তোমার কথা মনে হয় রবিদা? ” “তীব্র ঘৃণার পাশপাশি খুব কাছে কেন বাস করে সেই মধুর স্মৃতিটা? চোখ বুজে থাকি আমি, যেন হাসানকে দেখতে না হয়। আমার চোখের পাতায় দুটি মুখ মিলে মিশে যায়, একটি তোমার; সেদিনের সেই সর্বনাশী দুপুরে দেখা তোমার মুখ আর একটা নরম তুলতুলে শিশুর মিষ্টি মুখ । আমি খুব বুঝতে চেষ্টা করি ও কার মতো দেখতে, আমার মতো নাকি তোমার মতো?

না, আমি আমার একটা বাবুকেও বাঁচাতে পারি নি। এই নিয়ে তিনটি বাবু আমাকে ফাঁকি দিয়ে চলে গেছে, আমার বুকের ভিতরে একটার পর একটা মরুভূমি তৈরি করে। আমার পাপের শাস্তি হচ্ছে। “এই শাস্তির শেষ কবে?”

“জানো সেদিন ফেসবুকে তোমার পরিবারের ছবি দেখলাম। তুমি, তোমার বউ আর তোমার বৌর কোলে তোমাদের ফুটফুটে মিষ্টি মেয়েটা। কী নাম রেখেছ ওর? রুমঝুম? তুমি না বলতে মেয়ে হলে নাম রাখবে রুমঝুম। ” আমার ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল, ইচ্ছে হচ্ছিল ছিনিয়ে আনি তোমার মেয়েটাকে। “রবিদা পৃথিবীটা এত নিষ্ঠুর কেন? সেদিনের সেই পাপ কেন আমাকেই একা বয়ে যেতে হবে? কেন খুনের শাস্তি আমি একাই পাব? খুনি তো আমি একা না, তোমারও তো দায়ভাগ ছিল।বল, ছিল না?”


এই বিভাগের আরও খবর

  • ইভ টিজিংয়ের দুষ্টচক্র থেকে মুক্তি পাক নতুন প্রজন্ম

  • আমি কে?

  • ‘মেয়েদের বুঝ ছেলেদের চেয়ে কম থাকে’

  • ঢাবিতে ভর্তিযুদ্ধ শুরু

  • রূপা, তুমি ক্ষমা করো না

  • ফিন্যান্স, ব্যাংকিং ও বীমা প্রথম পত্র

  • ভাইয়া, ওরা আমাকে মারবে না তো?

  • পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন তরুণরা যখন প্রবীণ হবে

  •