Dhaka, Sunday, August 20, 2017

Navigation Bottom Left
Navigation Bottom Right
Post page // Before Title
Post page // Before Title

প্রেমের ফাঁদে গোদাগাড়ীর সেই তরুণীটি বিয়ে ছড়াই সন্তানের মা, অতঃপর ..

রিমন রহমান : তরুণীটির বয়স এখন ১৮ বছর। চার বছর আগে দশম শ্রেণিতে পড়ার সময় গর্ভধারণ করেন তিনি। এখন সন্তানের বয়স সাড়ে তিন বছর। তরুণীটি ছেলেকে নিয়ে ‘মহিলা সহায়তা কর্মসূচি’র আবাসন কেন্দ্রে থেকেছেন তিন বছর। সেখান থেকেই পরীক্ষা দিয়েছে এসএসসি এবং এইচএসসি পাস করেন। নিজের পায়ে দাঁড়াতে এখন পড়াশোনা করতে চান নার্সিংয়ে। কিন্তু নাসিং কলেজ তাকে ভর্তি করতে চায় না।

নার্সিং কলেজ কর্তৃপক্ষের যুক্তি, বিবাহিতরা সেখানে ভর্তির জন্য আবেদন করতে পারে না। মেয়েটি বিবাহিত না হলেও তার সন্তান থাকার কারণে তাকে ভর্তি নিতে চাইছে না প্রতিষ্ঠানটি।

তরুণীটি তার সন্তান নিয়ে এলাকায় থাকতে পারে না সামাজিক চাপে। কারণ, মা হওয়ার পর তাকে গ্রাম থেকে বের করে দিতে চেয়েছিল মাতুব্বররা। পরে অনুনয় বিনয়ের পর তারা শর্ত দেয়, বাচ্চা নিয়ে থাকা যাবে না। পরে বাচ্চাটিকে অন্য জায়গায় রাখতে বাধ্য হচ্ছে মেয়েটি।

এই মায়ের বাড়ি রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার বটতলী গ্রামে। প্রেমের ফাঁদে ফেলে ২০১৩ সালের ৬ জুন এক যুবক তাকে ধর্ষণ করেছিল। এতে তরুণীটি গর্ভবতী হয়ে পড়লে ওই যুবক তাকে অস্বীকার করে। এরপর তিনি তার প্রেমিকের বিরুদ্ধে মামলা করেন। এ মামলায় গত ৩০ মে আদালত আসামি আরিফ হোসেনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ দেয়।

এসএসসিতে চারটি বিষয়ের পরীক্ষার পর ২০১৪ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে সন্তানের জন্ম দেন তরুণীটি। সন্তানকে নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থাতেই দুটি পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়। এরই মধ্যে তাকে বিয়ে করার জন্য মেয়েটির কথিত প্রেমিককে গ্রামের লোকজন চাপ দিতে থাকেন। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদে সালিশও বসে।

কিন্তু সেখানে ওই যুবক সবকিছুই অস্বীকার করে। মেয়েটি তখন রাজশাহী মেডিকেল লেজ হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি) চিকিৎসাধীন। সালিশে প্রেমিক অস্বীকার করায় উল্টো দোষ পড়ে মেয়েটির ওপরেই। বাধ্য হয়ে মেয়েটি তখন ওসিসি থেকেই ধর্ষণ মামলা করে। আর মামলার পর পুলিশ আসামিকে গ্রেপ্তার করে। এরপর ওই যুবক, মেয়ে এবং তার সন্তানের ডিএনএ পরীক্ষা করা হয়।

পরীক্ষায় প্রমাণ হয় ওই যুবকই শিশুটির বাবা। পরে আদালতে মামলার বিচার শুরু হয়। এর আগে মামলার পরই আদালত ওই মেয়েটিকে ‘মহিলা সহায়তা কর্মসূচি’র রাজশাহী বিভাগীয় আবাসন কেন্দ্রে পাঠানোর নির্দেশ দেন। এসএসসির বাকি লিখিত এবং ব্যবহারিক পরীক্ষাগুলোতে ওই মেয়েটি আবাসন কেন্দ্র থেকেই অংশ নেয়।

গত সোমবার দুপুরে তরুণীটির বাড়িতে গেলে তিনি জানান, প্রায় তিন বছর ছেলেকে নিয়ে আবাসন কেন্দ্রে থাকতে হয়েছে তাকে। সেখান থেকেই সে একটি কলেজে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হন। কিন্তু সরকারি হেফাজতে থাকায় তিনি কলেজে যেতে পারতেন না। এ জন্য আবাসন কেন্দ্রের একজন কর্মকর্তা তাকে বই কিনে দেন। সেখানে বসেই পড়াশোনা চালিয়ে যান তরুণীটি।

প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে এইচএসসিতে বিজ্ঞানের বদলে মেয়েটিকে ভর্তি হতে হয়েছিল মানবিক বিভাগে। এসএসসিতে মেয়েটি পেয়েছিলেন জিপিএ-৪.১৯। ২০১৬ সালে এইচএসসিতে অংশ নিয়ে তথ্য ও প্রযুক্তি বিষয়ে ফেল করার পরের বছর আবার পরীক্ষা দিয়ে জিপিএ-৩.১৭ পেয়ে উত্তীর্ণ হন তিনি।

তরুণীটি জানান, সন্তান প্রসবের পর গ্রামের লোকজন তাদের পরিবারকে গ্রামছাড়া করতে চেয়েছিল। তার মা তখন গ্রামের লোকদের হাত-পা ধরে পড়ে যান। গ্রামের লোকজন শর্ত দেয়- পরিবারটিকে গ্রামে থাকতে দেওয়া হবে, কিন্তু মেয়েটি তার সন্তান নিয়ে গ্রামে ফিরতে পারবে না। এ নিয়ে তারা একটি কাগজে তার বাবা-মায়ের স্বাক্ষরও নেয়। এ জন্য তিন বছরেরও বেশি সময় তাকে গ্রামের বাইরে থাকতে হয়েছিল।

মাস তিনেক আগে তরুণীটিকে আবাসন কেন্দ্র থেকে ছাড়া হয়। কিন্তু তখনও তিনি সন্তান নিয়ে গ্রামে ফেরার সাহস পাননি। প্রায় একমাস তাকে থাকতে হয় আত্মীয়-স্বজনদের বাড়িতে বাড়িতে। পরে তিনি হাসপাতালের ওসিসি বিভাগকে বিষয়টি জানান। সাহায্যে এগিয়ে আসেন আইনজীবী আশুরা খাতুন আশা এবং জাতীয় মহিলা আইনজীবী পরিষদের বিভাগীয় প্রধান দিল সেতারা চুনি। তারা মেয়েটিকে বাড়িতে রেখে আসেন।

আইনজীবী সেতারা চুনি বলেন, ‘মেয়েটিকে নিয়ে যখন গ্রামে গেলাম, তখনও গ্রামের লোকজন তাকে মেনে নিতে চাইছিল না। আমরা তার আত্মীয়-স্বজনসহ গ্রামের লোকদের বুঝিয়েছিলাম। কথা বলেছিলাম মেয়েটির স্কুলের শিক্ষকদের সঙ্গেও। পরে তাকে বাড়িতে রেখে আসি।’

তরুণীটি জানান, এখনও গ্রামের কেউ কেউ তার সন্তানকে নিয়ে কটূক্তি করে। এসব শুনে তার খুব কষ্ট হয়। কিন্তু গ্রামের লোকের কথায় তিনি থেমে যেতে চান না। হতে চান একজন নার্স। নার্সিং শেষ করে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে ছেলেকেও মানুষের মতো মানুষ করতে চান। কিন্তু সন্তানের কারণে সে আদৌ নার্সিং কলেজে ভর্তি হতে পারবে কি না তা নিয়ে ভয়ে আছেন তিনি।

তরুণী বলেন, ‘মানসিক যন্ত্রণা ছিল অনেক। এতো প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও পড়াশোনা বন্ধ করিনি। ছোটবেলা থেকেই ইচ্ছে নার্স হবার। কিন্তু এখন ভর্তির নিয়মকানুন জানতে গিয়ে শুনছি, সন্তানের মা নার্সিং কলেজে ভর্তি হতে পারবে না। এতোকিছু জয় করেও আমাকে কি এখানেই থেমে যেতে হবে?’। কোলের বাচ্চা দেখিয়ে মেয়েটি বলেন, ‘এর জন্য হলেও আমাকে আমার লক্ষ্যে পৌঁছাতে হবে।’

রাজশাহী সরকারি নার্সিং কলেজের অধ্যক্ষ মনিজ্জা খাতুন জানান, ‘নার্সিং কলেজে ভর্তির প্রথম শর্ত হলো- ছাত্রী বিবাহিত হতে পারবে না।’ বিষয়টি নিশ্চিত হতে সরকারি হাসপাতালে তাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষায় ছাত্রীর বয়স, সে শারীরিক সম্পর্ক করেছে কি না, এমনকি তার সন্তান প্রসব হয়েছে কি না, সেসব বিষয় ধরা পড়ে। কারও এমন কিছু পাওয়া গেলে তার ভর্তি বাতিল করা হয়। এটা সরকারি-বেসরকারি সব নার্সিং কলেজেরই নিয়ম।

তবে মহিলা আইনজীবী পরিষদের বিভাগীয় প্রধান দিল সেতারা চুনি বলছেন, ‘এই নিয়ম সবার জন্য হওয়া উচিৎ নয়। এটা অমানবিক। এই মেয়েটির মতো যারা ভিকটিম, তাদের বিশেষ বিবেচনায় নার্সিং কলেজে ভর্তির সুযোগ দেয়া দরকার। কারণ, এই পরিস্থিতির জন্য সে নিজে দায়ী না। তার সঙ্গে যা হয়েছে, তা অন্যায়। এটা আদালতেও প্রমাণ হয়েছে। তাই মেয়েটির পাশে সবার দাঁড়াতো উচিত।’

মেয়েটি যখন মহিলা সহায়তা কর্মসূচির আবাসন কেন্দ্রে ছিল তখন সেখানকার সহকারি পরিচালক ছিলেন শবনম শিরীন। তিনি বলেন, অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারের এই মেয়েটি মানসিকভাবে খুব শক্ত এবং সংগ্রামী। তার মাঝে প্রচণ্ড রকমের মাতৃত্ববোধও রয়েছে। সে নিজেই পড়াশোনা চালিয়েছে, মামলায় জিতেছে, সন্তানকেও লালন-পালন করেছে।

শবনম শিরীন জানান, একবার এক নিঃসন্তান দম্পতি মেয়েটির সন্তানকে নিয়ে নিতে চেয়েছিল। কিন্তু মেয়েটি রাজি হয়নি। ওই সময় মেয়েটি বলেছিল- সে নার্সিংয়ে পড়াশোনা করবে। নার্স হয়ে সে তার বাচ্চাকে মানুষের মতো মানুষ করবে। কিন্তু তখন সে নার্সিংয়ে ভর্তির নিয়মকানুন জানতো না। শবনম শিরীন জানলেও তিনি সেদিন তাকে কিছু বলতে পারেননি।

Post Page // After Content
Post Page // After Content